স্মৃতিস্তম্ভ নেই, স্মৃতিও হারাতে বসেছে শায়েস্তাগঞ্জের বধ্যভূমি
মহান মুক্তিযুদ্ধের ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও অবহেলা ও অযত্নে পড়ে আছে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ বধ্যভূমি। একাত্তরের গণহত্যার নীরব সাক্ষী এই ঐতিহাসিক স্থানে আজও নির্মিত হয়নি কোনো পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিস্তম্ভ। কয়েকটি পাকা পিলার ও একটি সাইনবোর্ড ছাড়া নেই ইতিহাস সংরক্ষণের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে ক্রমেই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে ভয়াল সেই অধ্যায়।
শায়েস্তাগঞ্জ রেল জংশনের পাশের এই বধ্যভূমিতে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ১১ জন নিরীহ মানুষ। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় চুনারুঘাট উপজেলার লালচাঁন্দ চা-বাগান থেকে জনপ্রতিনিধিসহ ১১ জন চা শ্রমিককে ধরে এনে হত্যা করা হয় এবং এখানে তাঁদের গণকবর দেওয়া হয়।
শহীদরা হলেন—রাজকুমার গোয়ালা, লাল সাধু, কৃষ্ণ বাউরী (মেম্বার), দীপক বাউরী, মহাদেব বাউরী, অনু মিয়া, সুনীল বাউরী, নেপু বাউরী, রাজেন্দ্র রায়, গৌর রায় ও ভুবন বাউরী। তাঁদের মধ্যে অনু মিয়া ছিলেন একমাত্র মুসলিম।
সরেজমিনে দেখা যায়, বধ্যভূমিটি রেললাইনের একেবারে পাশে হওয়ায় সেখানে যেতে হলে ঝুঁকিপূর্ণভাবে রেললাইন পার হতে হয়। শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার উদ্যোগে শায়েস্তাগঞ্জ–হবিগঞ্জ সড়ক থেকে একটি পাকা সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হলেও সেটি বর্তমানে সিএনজি অটোরিকশার দখলে থাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যার পর বধ্যভূমির আশপাশে নেশাগ্রস্তদের আনাগোনা বাড়ে। এতে শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র স্থানটির মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এক মুক্তিযোদ্ধা ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি ভবন নির্মাণ করে দিলেও আশপাশে অবাধে মলমূত্র ত্যাগের কারণে সেটিও আজ অযত্নে পড়ে আছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, স্বাধীনতার এত বছর পরও বধ্যভূমিটিতে কোনো পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়নি। দায়সারা ভাবে একটি সাইনবোর্ড ও কয়েকটি পিলার দিয়েই কেবল স্থানটির অস্তিত্ব চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, মুক্তিযোদ্ধা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বধ্যভূমিটি সংরক্ষণ, যথাযথ চিহ্নিতকরণ এবং একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে শায়েস্তাগঞ্জের এই বধ্যভূমিসহ একাত্তরের বহু গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে—যা জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: