টানা তিন দিন উঁকি দেয়নি সূর্য
চুনারুঘাটে পাহাড় ও চা–বাগান এলাকায় শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন
টানা তিন দিন ধরে সূর্যের দেখা না মেলায় হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে। মেঘলা আকাশ, ঘন কুয়াশা ও হিমেল বাতাসে পাহাড়ি ও চা–বাগান অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন চা–শ্রমিক, দিনমজুর ও পাহাড়ি দরিদ্র পরিবারের মানুষ।
উপজেলার বিভিন্ন চা–বাগানে ভোরে ঘন কুয়াশা ও কনকনে ঠান্ডার কারণে শ্রমিকেরা সময়মতো কাজে যেতে পারছেন না। এতে দৈনিক আয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ছে। চানপুর চা–বাগানের শ্রমিক রামেশ তেলেঙ্গা বলেন, ‘ভোরে এত ঠান্ডা থাকে যে ঘর থেকে বের হওয়াই কঠিন। কাজে যেতে না পারলে সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে।’
রেমা–কালেঙ্গা ও সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানসংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় শীতের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি। এসব এলাকায় শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে ঠান্ডাজনিত রোগ বাড়ছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, জ্বর, ঠান্ডা–কাশি ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে।
চুনারুঘাট পাহাড়ি ও চা–বাগান অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় প্রতি বছরই শীতে তাপমাত্রা তুলনামূলক কম থাকে। বর্তমানে তাপমাত্রা ১৪ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। এতে উপজেলার ২৪টি চা–বাগানসহ রেমা–কালেঙ্গা ও সাতছড়ি এলাকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেককে ফুটপাতের দোকান থেকে পুরোনো গরম কাপড় কিনতে দেখা গেছে।
চাপুঞ্জি, সাতছড়ি ও পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় ভোররাত থেকেই ঘন কুয়াশা পড়ছে। বেলা গড়ালেও সূর্যের দেখা মিলছে না। ঘন কুয়াশার কারণে সড়কে যানবাহন চলাচলে সমস্যা দেখা দিয়েছে। দিনের বেলাতেও অনেক যানবাহনকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলতে হচ্ছে, এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা শহর ও হাটবাজারে পুরোনো গরম কাপড়ের চাহিদা বেড়েছে। তবে দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের পক্ষে প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। চান্দপুর চা–বাগানের শ্রমিক রীনা তেলেঙ্গা বলেন, ‘ঘর জরাজীর্ণ, গরম কাপড় নেই। শীতে কষ্ট দ্বিগুণ হয়ে যায়।’
সাতছড়ি ত্রিপুরাপল্লির আদিবাসী নেতা চিত্তরঞ্জন দেববর্মা বলেন, পাহাড়ি এলাকার মানুষ শীতে খুব কষ্টে আছেন। এখনো পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র সহায়তা পৌঁছায়নি। রেমা–কালেঙ্গা এলাকার বাসিন্দা মঙ্গল মুরং বলেন, ‘রাতে প্রচণ্ড ঠান্ডায় ঘুমানো যায় না। গরম কাপড় না থাকায় আগুন পোহাতে হয়।’
চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর চাপ বেড়েছে। দায়িত্বরত নার্স লিপি আক্তার জানান, ঠান্ডাজনিত রোগে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমার রোগীর সংখ্যাই বেশি।
কৃষকরাও শীত ও কুয়াশা নিয়ে উদ্বিগ্ন। বোরো ধানের বীজতলা রক্ষায় পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হচ্ছে বলে জানান কয়েকজন কৃষক। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. শহিদ উল্ল্যাহ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে শীতবস্ত্র পাওয়া গেছে। শিগগিরই তা অসহায় ও দুস্থ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হবে।
আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন একই রকম থাকলে শীতের তীব্রতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তারা দ্রুত সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: