বড়লেখায় তিনটি ইউনিয়নকে ‘পাকিস্তান’ বললেন জামায়াত নেতা
Led Bottom Ad

প্রতিবাদে সরব সামাজিক মাধ্যম

বড়লেখায় তিনটি ইউনিয়নকে ‘পাকিস্তান’ বললেন জামায়াত নেতা

নিজস্ব প্রতিনিধি, বড়লেখা

১০/০৭/২০২৫ ১৩:২২:১১

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

‘বড়লেখায় যে তিনটি ইউনিয়ন পাকিস্তান খ্যাত,সেই তিন ইউনিয়নে আগামী নির্বাচনে ইনশাল্লাহ আমরা শতভাগ জিতে আসবো।’ কথাগুলো এক সভায় বলছিলেন, বড়লেখা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মো. আব্দুল বাছিত। জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী মাওলানা আমিনুল ইসলামের সমর্থনে ৫ জুলাই উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের নয়াবাজারে একটি মতবিনিময় সভায় তিনি বক্তব্য রাখতে গিয়ে এ কথা বলেন। তার বক্তব্যের ভিডিও বার্তা মুহুর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এ বক্তব্যে পর শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। 


যেভাবে ঘটনার শুরু

মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী মাওলানা আমিনুল ইসলামের সমর্থনে গত ৫ জুলাই সন্ধ্যায় উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের নয়াবাজারে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তব্য রাখেন উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. আব্দুল বাছিত। এ সময় তিনি বলেন,‘বড়লেখা উপজেলায় পকিস্তান খ্যাত তিনটি ইউনিয়ন আছে, আমি যা জানি। এই ইউনিয়নগুলো হলো ১ নম্বর দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন, উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়ন এবং দক্ষিণভাগ ইউনিয়ন। এই তিনটা ইউনিয়নে আমরা ইনশাল্লাহ জামায়াত ইসলাম জিতে যাবে। আলহামদুলিল্লাহ।’ তার বক্তব্যের ওই অংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় মানুষের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। 


নিন্দা ও প্রতিবাদ

উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মো. আব্দুল বাছিতের বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে পৃথকভাবে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়ন ও দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন শাখা। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি শাহিন আহমদ ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান এবং বুধবার (৯ জুলাই) দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-দপ্তর সম্পাদক মো. পারভেজ আহমদ স্বাক্ষরিত পৃথক বিবৃতিতে বক্তব্যটির নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। 


বিবৃতিতে বলা হয়, ছাত্রদল গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের সাথে লক্ষ্য করছে, মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা সংগঠন জামায়াতের উপজেলা সেক্রেটারি সম্প্রতি তাদের দলের একটি সভায় উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়ন ও দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নসহ উপজেলার তিনটি ইউনিয়নকে ‘পাকিস্তান’ ঘোষণা করার মতো একটি গর্হিত ও হঠকারী স্টেটমেন্ট দিয়েছেন। উপজেলার সর্বাধিক মুক্তিযোদ্ধা অধ্যুষিত অঞ্চলের নাগরিক হিসেবে তারা মনে করেন, এটি একটি বক্তব্যই নয় শুধু। বরং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন। সেইসাথে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অবমাননাও। মুক্তিযুদ্ধকে পূঁজি করে নোংরামিতে লিপ্ত হওয়া ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনাকে তাড়ানোর মানে এই নয়, ভূখন্ডের অস্তিত্ব, মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনোধরনের হঠকারিতা বা আপস মেনে নেওয়া হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দয়া-দাক্ষিণ্যে অর্জিত নয়। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। ছাত্রদল এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, এই গর্হিত কাজের জন্য ব্যক্তি ও দলকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। সেইসাথে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অস্বীকারকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সরকারের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, ছাত্রদল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে এদেশের জনগণ দল, মত ও পথে ভিন্ন আদর্শ লালন করতে পারে। কিন্তু স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মধ্যপন্থার বাংলাদেশের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ। কোনো অপশক্তি কখনো এই ভিত্তি দুর্বল করতে পারবে না। 


উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি শাহিন আহমদ এবং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মো. শরীফ উদ্দিন ও সহদপ্তর সম্পাদক মো. পারভেজ আহমদ প্রতিবাদ-বিজ্ঞপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, জামায়াত নেতার এই বক্তব্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত। যা আমাদের ব্যতীত করেছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। 


যা বলছেন উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো.আব্দুল বাছিত

বড়লেখা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. আব্দুল বাছিত বলেন, সেদিন আমার বক্তব্য অনেক দীর্ঘ ছিল। কেউ ২৭ সেকেন্ডের একটি অংশ আপলোড করেছে। গত ১৫-১৭ বছরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে এই তিনটি ইউনিয়নে জামায়াত-শিবিরের বড় ভূমিকা ছিল। সে কারণে পুলিশ প্রশাসন ও কিছু সংগঠন এই ইউনিয়নগুলোকে পাকিস্তান বলত, সেই প্রসঙ্গেই কথাটি বলেছি। তিনি আরও বলেন, ২০১৮ সালে পুলিশ যখন আমাকে গ্রেপ্তার করেছিল, তখনও তারা এ শব্দ ব্যবহার করেছিল। মূলত পুলিশের মন্তব্য বোঝাতেই কথাটি বলেছি। বাংলাদেশ পাকিস্তান নয়, এটি স্বাধীন রাষ্ট্র। তবে তিনি দাবি করেছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে তার কথার খণ্ডাংশ ছড়িয়ে দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। 


আব্দুল বাছিতের ছড়িয়ে পড়া সেই বক্তব্য হুবহু 

‘আমরা সবাই মিলে একবার আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। আলহামদুলিল্লাহ। আপনারা অনেক আশা দেখিয়েছেন। বড়লেখা উপজেলায় পাকিস্তান খ্যাত তিনটি ইউনিয়ন আছে। আমি যা জানি-এক নম্বর দক্ষিণ শাহাজপুর, উত্তর শাহাজপুর ইউনিয়ন এবং দক্ষিণভাগ ইউনিয়ন। আমরা ইনশাআল্লাহ, এই তিনটি ইউনিয়নে-কমপক্ষে আমার ধারণা-আমরা জিতে গেছি। আলহামদুলিল্লাহ! আর একটু জোরে বলেন, আলহামদুলিল্লাহ! সম্মানীত উপস্থিতি, আপনাদের কাছে আমরা জামায়াতে ইসলামি, ইসলামী ছাত্রশিবির হিসেবে চির ঋণি। আজকের এই বৃষ্টি হচ্ছে-আমি চিন্তা করতেছি, ২০১৩ সাল, ১৪ সালে যখন রাতে বৃষ্টি হতো, তখন চিন্তা করতাম, আজ আর পুলিশ বাড়িতে আসবে না আমাদের। যেহেতু বৃষ্টি হচ্ছে, পুলিশ নাও বের হতে পারে।’


‘আল্লাহ রাব্বুল আলামিন, আপনাদের সহযোগিতা, দোয়ায় মাধ্যমে আমরা এই পর্যায়ে পৌঁছাইছেন। এই কঠিন সময়ে জামায়াতে ইসলামি এই বাংলাদেশ ত্যাগ করে নাই। করেছে? ত্যাগ কিন্তু করে নাই। জামায়াতে ইসলামি এমন সংগঠন-দুঃখের সময় আপনাদের পাশে আছে। সুখের সময়ও পাশে আছে, ইনশাআল্লাহ।


‘সম্মানিত উপস্থিতি, আমি দক্ষিণ শাহবাজপুর বাড়ি, এই দুইটা ইউনিয়ন থেকে আমিন ভাইকে বলতে পারি, বড়লেখা উপজেলায় অন্য ইউনিয়ন বলতে পারি নাই। এই দুইটা ইউনিয়নে যতটা সেন্টার আছে, প্রত্যেকটা সেন্টারে একটা প্রতীক এবং একজন মানুষ-তিনি হলেন মাওলানা আমিনুল ইসলাম। ’


‘সম্মানিত উপস্থিতি, শেষ কথা হল, যেহেতু আমরা পাশ করে ফেলেছি, এবারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে-আমাদের ভোটকে হেফাজত করতে হবে। পারবেন তো ইনশাআল্লাহ? আমাদেরকে জেল, জুলুম, ফাঁসি দিয়ে বাংলাদেশ থেকে সরাতে পারে নাই। ইনশাআল্লাহ আমিন ভাইয়ের বিজয় না হওয়া পর্যন্ত এই শাহাবাজপুর থেকে একজন মানুষ রাজাপথ থেকে বাড়িতে যাবে না, ইনশাআল্লাহ।’


‘আওয়ামী লীগের মতো কিছু মানুষ আবার প্রস্তুতি নিচ্ছে-আমাদের ভোট বাক্স ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য। বিশ্বাস করেন, সম্মানিত উপস্থিতি-আমীরে জামায়াত বলেছেন, আমাদের ভোটের বাক্স, আমাদের এই আমানতকে কেউ যদি হাত বাড়ায়, তার হাতকে অবশ করে দেওয়া হবে। সে যতবার প্রতিবাদ করবে, এবার এই বাংলাদেশে আমরা এই ভোট ব্যাংক ইনশাআল্লাহ রক্ষা করব। যদি আমাদের শহীদ হতে হয়-এই উত্তর শাহবাজপুর থেকে জানতে চাই, শহীদ হওয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন? বদরের যুদ্ধে ৩১৩ জন প্রস্তুতি নিয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সবাইকে সাহায্য করেছিলেন। ইনশাআল্লাহ, আমরাও শহীদ হওয়ার জন্য প্রস্তুত হই। নতুন বাংলাদেশ হবে। এই বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায় একটি প্রতীক আসবে। সেই প্রতীকের নাম হবে দাঁড়িপাল্লা। ইনসাফের প্রতীক হবে দাঁড়িপাল্লা। ইনশাআল্লাহ-সেই স্বপ্ন দেখেন। আল্লাহ পাক বাস্তবায়ন করবেন।’

মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad