শাল্লায় ‘হাওরের ডাকাত’: অভিযোগে উত্তাল কৃষক
Led Bottom Ad

শাল্লায় ‘হাওরের ডাকাত’: অভিযোগে উত্তাল কৃষক

নিজস্ব প্রতিনিধি, শাল্লা

০৩/০৩/২০২৬ ১৯:৫৯:০৩

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলা-য় হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ প্রকল্পের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে ব্যাপক অনিয়ম, ঘুষ-দুর্নীতি ও নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, কাঙ্ক্ষিত টাকা না দিলে প্রকল্প অনুমোদন মিলছে না; আবার কাজ শুরুর পরও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করে প্রকল্প অন্যের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।


উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাসের নেতৃত্বে একটি ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে—এমন অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের ভাষ্য, কাবিটা স্কিম-সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা শাখা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের মাধ্যমে প্রতিটি প্রকল্পে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।


‘দুই লাখ দিলে ওয়ার্ক অর্ডার, না দিলে কাজ বন্ধ’

ছায়ার হাওরের ১২২ নম্বর পিআইসির সভাপতি রাঁধা গোবিন্দ দাস বলেন, “ওরা হাওরের ডাকাত, ওদের হাত থেকে আমাদেরকে বাঁচান। দুই লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার পর ওয়ার্ক অর্ডার পাই। ৪০–৫০ শতাংশ কাজ করার পর আবার এক লাখ টাকা দাবি করে। দিতে না পারায় মৌখিকভাবে কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়।”


তিনি জানান, এক্সকাভেটর ও ড্রাম ট্রাকের মালিকদের দৈনিক প্রায় ১০ হাজার টাকা করে ভর্তুকি দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচের পর জানতে পারেন, প্রকল্পটি অন্য ব্যক্তির কাছে দেওয়া হয়েছে। পরে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করলেও কার্যকর পদক্ষেপ পাননি বলে দাবি তাঁর।


একই ধরনের অভিযোগ করেছেন ৭১ নম্বর পিআইসির সভাপতি প্রসেনজিৎ দাস। তাঁর ভাষ্য, “দুই লাখ টাকা দেওয়ার পর অনুমোদন পাই। ২৫–৩০ শতাংশ কাজের পর আরও এক লাখ টাকা চাওয়া হয়। অস্বীকৃতি জানালে প্রকল্প অন্যকে দেওয়া হয়।”


জমিহীন ও বহিরাগতদের পিআইসি?

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, যাদের বাঁধসংলগ্ন জমি নেই বা অন্য উপজেলার বাসিন্দা—তাঁদেরও পিআইসি দেওয়া হয়েছে। ৭০ নম্বর পিআইসি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে কয়েকজন কৃষক বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যা মামলার নথি থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সভাপতি করা হয়েছে। বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হলেও তদন্ত হয়নি বলে অভিযোগ।


মৌরাপুর, ভোলানগর, উজানগাঁও ও ভাটি ইয়ারাবাদ গ্রামের কয়েকজন কৃষক বলেন, তাঁদের জমির ওপর দিয়ে বাঁধ নির্মাণ হলেও পিআইসি থেকে তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে তিন থেকে চার কেদার জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেন তাঁরা।


তিন দফা হাতবদল ১২২ নম্বর প্রকল্প

কৃষকদের অভিযোগ, ১২২ নম্বর প্রকল্পটি তিনবার হাতবদল হয়েছে। প্রথমে একজনকে অনুমোদন, পরে অন্যজনকে; আবার কাজ শুরুর পরও পরিবর্তন করা হয়েছে। ২৭২ মিটার দৈর্ঘ্যের বাঁধে ২৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।


কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে শাখা কর্মকর্তা ওবায়দুল হক বলেন, “ঘুষ নিয়ে পিআইসি দেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়। তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী উপজেলা কমিটির অনুমোদনে পরিবর্তন হয়েছে।”


উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, বরাদ্দ ও প্রকল্প পরিবর্তনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শাখা কর্মকর্তার বক্তব্যই প্রযোজ্য। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।


এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ইলিয়াছুর রহমান বলেন, “অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা কমিটি বসেছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কিছু পিআইসিতে কাজ না হওয়ায় পরিবর্তন করা হয়েছে।” তবে পৃথক তদন্তের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু জানাননি।


তদন্তের দাবি

কৃষকদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ প্রকল্প প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রকৃত কৃষকেরাই।


স্থানীয়দের ভাষায়, “হাওর বাঁচলে কৃষক বাঁচবে। আর কৃষক বাঁচলে বাঁচবে এই অঞ্চল।”

আমির হোসেন

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad