উচ্ছেদ আতঙ্কে নির্ঘুম রাত
আবাসন কোম্পানির হুমকির মুখে সিলেটের ১৫টি গারো পরিবার
সিলেট সদর উপজেলার খাদিমনগর ইউনিয়নের কল্লগ্রামের ফিসারি ছড়ারপাড়ে ছয়-সাত দশক ধরে বসবাসরত ১৫টি গারো পরিবারসহ মোট ১৬টি পরিবার এখন উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয় ‘চেয়ারম্যান সিটি হাউজিং কোম্পানি’র লোকজন জমি ছেড়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি ও চাপ প্রয়োগ করায় অসহায় এই পরিবারগুলো চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
দীর্ঘদিন ধরে ওই স্থানে বসবাস করা মেরি চিসাম (৭৫) কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, “মা-বাবা ও দাদা-দাদির সময় থেকেই আমরা এখানে আছি। এখন বৃদ্ধ বয়সে এসে শুনতে হচ্ছে আমাদের উচ্ছেদ করা হবে। আমরা গরিব মানুষ, এখন বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে কোথায় যাব?”
বাসিন্দাদের অভিযোগ, হাউজিং কোম্পানির লোকজন রাতের আঁধারে মাটি ভরাট করে ছড়ার গতিপথ পরিবর্তন করছে এবং বসতভিটার চারপাশে পাকা খুঁটি পুঁতে জমি দখলের পাঁয়তারা চালাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ২৫ দশমিক ৭ ডেসিমেল জায়গায় ছোট ছোট ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন প্রায় ৮০-৯০ জন মানুষ। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদকে নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স প্রদানকারী এই পরিবারগুলোর জাতীয় পরিচয়পত্র ও স্থায়ী ঠিকানা থাকা সত্ত্বেও আজ তাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, ছড়ার পাড়ের এই জমি এক সময় জঙ্গল ছিল, যা তারা নিজেদের পরিশ্রমে আবাদযোগ্য ও বাসযোগ্য করে তুলেছেন।
আদিবাসী গবেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, “আইনগতভাবে হয়তো তাদের কোনো দলিল নেই, কিন্তু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের অধিকারকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তারা কয়েক প্রজন্ম ধরে এখানে অভিযোজিত হয়েছে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় তাদের পুনর্বাসন করা সময়ের দাবি।”
পরিবেশকর্মী আব্দুল করিম কিম বলেন, “প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা ছড়ার গতিপথ পরিবর্তন করা ঠিক হবে না। পুনর্বাসন ছাড়া কোনোভাবেই এই শান্তিপ্রিয় জনগোষ্ঠীর পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করা যাবে না।”
অভিযোগের বিষয়ে ‘চেয়ারম্যান সিটি হাউজিং কোম্পানি’র পরিচালক আশরাফুল আলম আহাদ দাবি করেন, তিনি কাউকে হুমকি দেননি। তিনি জানান, ছড়ার জমি হাউজিংয়ের জায়গায় ঢুকে পড়েছে বিধায় তারা কেবল নিজেদের জমি উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, রাতের বেলায় জোরপূর্বক মাটি ভরাট ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের উচ্ছেদের চেষ্টা চলছে।
সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোশনূর রুবাইয়াৎ বলেন, “বাসিন্দারা খাস জমিতে রয়েছেন। আমি তাদের আশ্বাস দিয়েছি যে, পুনর্বাসন ছাড়া কাউকে উচ্ছেদ করা হবে না। হাউজিং কোম্পানির কৃষি জমি ভরাট ও শ্রেণি পরিবর্তনের বৈধতার বিষয়টিও আমরা খতিয়ে দেখব।”
জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম জানান, বিষয়টি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
উচ্ছেদের বদলে পুনর্বাসনের এই প্রতিশ্রুতি কতটুকু রক্ষিত হয়, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় কল্লগ্রামের অসহায় বাসিন্দারা।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: