১৫০ কোটির বাঁধ যখন কৃষকের মরণফাঁদ!
Led Bottom Ad

১৫০ কোটির বাঁধ যখন কৃষকের মরণফাঁদ!

প্রীতম দাস, সুনামগঞ্জ

০৭/০৫/২০২৬ ১৩:৫০:৫০

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

বৈশাখের তপ্ত দুপুরে যেখানে হাওরজুড়ে ধানের মৌ মৌ গন্ধে কৃষকের উঠান মুখরিত থাকার কথা, সেখানে আজ বাতাসে ভাসছে পচা ধানের উৎকট গন্ধ। যে ধান কাটার উৎসব ঘিরে হাওরবাসীর চোখে ঘুম থাকার কথা ছিল না, সেই উৎসব এখন বিষাদে পরিণত হয়েছে। সুনামগঞ্জের দিরাই ও শাল্লার উদগল আর ছায়ার হাওরসহ জেলার প্রতিটি হাওরে এখন রূপালি জলের ঢেউ। আর সেই ঢেউয়ের নিচে অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে কয়েক হাজার কোটি টাকার স্বপ্ন।

​শাল্লা-মিলনবাজার সড়কে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। দিরাই উপজেলার নাছিরপুর গ্রামের কৃষক আলী নূর ও তার স্ত্রী সৈয়দা নূর পচা ও অঙ্কুর গজানো ধান শুকাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। দীর্ঘ সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকায় কাটা ধানে লম্বা অঙ্কুর (গ্যাড়া) গজিয়েছে। মাড়াই করা এই ধান শুকোতে দিলেই ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে।

​নিঃস্ব আলী নূর বলেন, নয় কিয়ার (২৮ শতাংশ) খেত করছিলাম, চাইর কিয়ার কাটছি, বাকি সব ডুবছে। যা কাটছিলাম হেইডাও ক্ষেতে ঝইরা গ্যাড়া আইয়া নষ্ট অইছে। আমি আর কোনো কাজ জানি না, কৃষিই আমার শেষ ভরসা। জমানো সব টাকা শেষ, এহন খোরাকির ধানটুকুও ঘরে উঠবে না।

​একই করুণ দশা হাসিমপুর গ্রামের ক্ষুদ্র কৃষক জগৎ রায় ও মাঝারি চাষি নিরাপদ দাসের। নিরাপদ দাস সঞ্চয়ের প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা খরচ করে ১৬ কিয়ার জমি করেছিলেন, যার অর্ধেকই এখন পানির নিচে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বউ স্কুলের দপ্তরির কাজ না করলে এই বছর না খাইয়া মরণ লাগব।

​শাল্লার চাকুয়া গ্রামের কৃষক কৃপেশ দাস ও রানু চন্দ্র দাসের অভিযোগ, অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে এবার ক্ষতি বেশি হয়েছে। রানু চন্দ্র বলেন, যদি জয়পুরের বেড়িবাঁধটি না থাকত, তবে বৃষ্টির পানি এভাবে আটকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো না। গত বছর বাঁধ ছিল না, এবার কেন দেওয়া হলো বুঝলাম না। একদিকে সরকারি টাকার অপচয়, অন্যদিকে আমাদের সর্বনাশ।

এদিকে, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় স্বজনপ্রীতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা। লৌলারচর গ্রামের কৃষক গণি মিয়া দাবি করেন, উপজেলা থেকে অফিসাররা এসে মেম্বারদের কাছে তালিকা চায়, আর মেম্বাররা নিজের আত্মীয়দের নাম দিয়ে দেয়। আমাদের দাবি, সরকার যেন যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেয়।

​মাঠের পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারি তথ্যের আকাশ-পাতাল পার্থক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। জেলা কৃষি বিভাগের দাবি, ইতোমধ্যে গড়ে ৮৩.৮৪৩ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। তবে এই তথ্যকে 'ভুল ও বিভ্রান্তিকর' বলে আখ্যা দিয়েছেন হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ।

মাঠের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সরকারি তথ্যের লুকোচুরি এবং বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম নিয়ে হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ ওবায়দুল হক বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি 'মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ' হিসেবে অভিহিত করে বলেন, কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্যের সাথে মাঠের বাস্তবতার কোনো মিল নেই। তারা এসি রুমে বসে ধান কাটার যে কাল্পনিক পরিসংখ্যান (৮৩.৮৪৩%) দিচ্ছে, তা কেবল বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সাথে এক ধরনের তামাশা। বাস্তবে হাওরের অর্ধেকের বেশি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আড়াল করার এই অপচেষ্টা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে, অন্যথায় কৃষকরা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হবেন।

​তিনি আরও বলেন, ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তথাকথিত বেড়িবাঁধ কৃষকের কোনো কাজে আসেনি। জয়পুরের বাঁধের মতো অনেক জায়গায় অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে বৃষ্টির পানি নামতে না পেরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে এবং ধান পচেছে। আমরা চাই, মেম্বার-চেয়ারম্যানদের পকেট তালিকা নয়, বরং সরাসরি মাঠে গিয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করা হোক এবং তাদের পুনর্বাসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।"

সুনামগঞ্জে এবছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে আবাদ হলেও সরকারি হিসাবে মাত্র ২০ হাজার ১২০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলা হচ্ছে। অথচ অতিবৃষ্টির পরিমাণ ছিল গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই বৈপরীত্যই জনমনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

​সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন। ইতোমধ্যে উচ্চপর্যায়ের দল হাওর পরিদর্শন করেছেন এবং প্রশাসনকে সঠিক পরিসংখ্যান পাঠানোর চাপ দেওয়া হচ্ছে।

​হাওর এখন আর হাসছে না সোনালি ধানের ঢেউয়ের জায়গায় এখন রূপালি জলের মাতম। প্রকৃতির আকস্মিক বৈরিতা আর প্রশাসনিক অদূরদর্শিতায় হাওরের অর্থনীতিতে যে ধস নেমেছে, তা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। অন্যথায়, দেশের এই অন্নদাতারাই আগামীতে চরম খাদ্য সংকটের মুখে পড়বে।

এ রহমান

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad