সুনামগঞ্জে ঝুঁকির রুপেশ্বরী: নদী সাঁতরে স্কুলে যায় শিক্ষার্থীরা
Led Bottom Ad

সুনামগঞ্জে ঝুঁকির রুপেশ্বরী: নদী সাঁতরে স্কুলে যায় শিক্ষার্থীরা

লতিফুর রহমান রাজু. সহযোগী সম্পাদক

১৬/০৫/২০২৬ ১৯:২৯:১৪

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

এক হাতে ভেজা বই-খাতা মাথার ওপর শক্ত করে ধরে রাখা, অন্য হাতে পানির তীব্র স্রোতের সঙ্গে লড়াই—এ কোনো অ্যাডভেঞ্চার বা খেলা নয়। এটি সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা উত্তর ইউনিয়নের ঘিলাঘড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুদের প্রতিদিনের নির্মম বাস্তবতা। এক টুকরো সেতুর অভাবে শিক্ষার আলো ছুঁতে গিয়ে প্রতিদিন জীবনের বাজি ধরছে এই অবহেলিত জনপদের শতাধিক শিশু।


বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া রুপেশ্বরী নদীটি যেন এই শিশুদের স্বপ্নের পথে এক বিশাল বাধা। নদী পার হওয়ার জন্য নেই কোনো স্থায়ী সেতু, নেই সামান্য একটি নিরাপদ সাঁকোও। শুষ্ক মৌসুমে কোনোমতে নদী পার হওয়া গেলেও, বর্ষা আসতেই পাহাড়ি ঢলে নদীটি হয়ে ওঠে ভয়ংকর। তখন রূপালী নদীর বুক চিরে বই-খাতা মাথায় তুলে সাঁতরে কিংবা কলাগাছের নড়বড়ে ভেলায় চড়ে স্কুলে যেতে হয় অবুঝ শিশুদের।


সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রীপুর, লক্ষ্মীপুর, ঘিলাঘড়া ও কলতাপাড়া গ্রামের প্রায় ১১০ জন শিশু এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। কিন্তু মেঘের ডাক আর বৃষ্টির ফোঁটা শুরু হলেই থমকে যায় তাদের শিক্ষাজীবন। নদীর পানির তীব্র স্রোত দেখে অনেক মা-বাবা বুক কেঁপে ওঠার ভয়ে সন্তানকে স্কুলেই পাঠাতে চান না। ফলে বর্ষার দিনগুলোয় ১১০ জন শিক্ষার্থীর স্কুলে উপস্থিতি নেমে আসে মাত্র ১৫ থেকে ২০ জনে।


এক বুক আতঙ্ক নিয়ে এক অভিভাবক বলেন, সন্তানকে যখন স্কুলে পাঠাই, ততক্ষণ বুকটা দুরুদুরু করে। কখন কী দুর্ঘটনা ঘটে যায়, সেই ভয়ে সবসময় অস্থির থাকি। এই চরের দেশে জন্ম নেওয়াই কি আমাদের বাচ্চাদের অপরাধ?


স্থানীয় বাসিন্দা মাহফুজ আলম আক্ষেপ করে বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে এই জনপদ চরম অবহেলিত। আমাদের শিশুদের অপরাধ তারা পড়তে চায়। কিন্তু একটা সেতুর অভাবে তাদের জীবনটা এভাবে ঝুঁকিতে থাকবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না।"


বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাজমুল হোসেন রানা বলেন, "বর্ষায় বাচ্চাদের এই কষ্ট চোখে দেখা যায় না। বুক সমান পানি পেরিয়ে, ভিজে একাকার হয়ে তারা যখন ক্লাসে এসে বসে, তখন বুকটা ফেটে যায়। কেউ সাঁতার কেটে আসে, কেউ ভেলায় চড়ে আসে। যেকোনো সময় বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।"


শিশুদের এই করুণ লড়াইয়ের কথা স্বীকার করে বংশীকুণ্ডা উত্তর ইউপি চেয়ারম্যান মো. নূর নবী তালুকদার বলেন, "বিষয়টি সত্যিই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও দুঃখজনক। শিশুদের এই কষ্ট দূর করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।"


উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন ‘প্রথম সিলেট’ কে জানান, বিষয়টি দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়ে একটি স্থায়ী ও নিরাপদ পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করা হবে।


যতদিন না সেই আশ্বাস বাস্তবে রূপ নিচ্ছে, ততদিন হয়তো এই শিশুদের শিক্ষার আলো পাওয়ার জন্য রুপেশ্বরী নদীর হিংস্র স্রোতের সঙ্গেই লড়াই করে যেতে হবে। একটি টেকসই সেতু কি পারবে না এই অবুজ শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে?

ডি আর ডি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad