মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিন: কর্মব্যস্ততার ভিড়ে এক ক্লান্তিহীন শব্দশ্রমিক
আদালতের এজলাসে তখন মানুষের ভিড়, মামলার নথিপত্রের স্তূপ আর আইনি যুক্তিতর্কের টানটান উত্তেজনা। সিলেট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারীর দায়িত্ব পালন করা চাট্টিখানি কথা নয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা—সারাদিন কাটে প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক ধকলের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এই তীব্র ব্যস্ততা আর নিয়মের বেড়াজাল যাঁর ভেতরের সৃষ্টিশীল সত্ত্বাকে বিন্দুমাত্র দমাতে পারেনি, তিনি মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিন। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে তিনি স্বস্তি খোঁজেন লেখনীর মাঝে, কাগজের বুকে কালির আঁচড়ে। সহজিয়া ভাষায় নিজের দর্শন, চিন্তা-চেতনা এবং যাপিত জীবনের নানা অধ্যায়কে পাঠকদের সামনে মেলে ধরাই তাঁর পরম আনন্দ।
শিকড় থেকে সৃষ্টিশীলতার বীজ
মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিনের জন্ম সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সুনামপুর গ্রামে, এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। পবিত্র ঈদুল আজহার এক আলোকময় অপরাহ্নে তিনি পৃথিবীতে আসেন। তাঁর পিতা মরহুম হাজী মোহাম্মদ কুটি মিয়া ও মাতা মরহুমা সমিরতা বিবি। দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম।
স্কুলজীবন থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর ছিল প্রবল ঝোঁক। সৃষ্টিশীল কাজের সেই যে বীজ বোনা হয়েছিল কৈশোরে, তা আজ এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। শিক্ষাজীবনেও তিনি মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। ১৯৮৬ সালে সিলেট জেলা মেধাভিত্তিক বৃত্তি পরীক্ষায় ‘ট্যালেন্টপুল’ বৃত্তি লাভ করেন। এরপর ১৯৮৯ সালে আল-এমদাদ দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৯১ সালে ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৯৩ সালে একই কলেজ থেকে বি.এসসি (গণিত) এবং পরবর্তীতে ২০০৯ সালে সিলেট ল' কলেজ থেকে এলএল.বি ডিগ্রি অর্জন করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ২০০৩ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর সহধর্মিণী শাহানাজ ছয়েফ ডলি একজন আদর্শ গৃহিণী। তিন কন্যা ও এক পুত্রের জনক ছয়েফ উদ্দিনের সংসার জীবন যেন এক শান্তিময় নীড়।
কর্মব্যস্ততা, ভ্রমণ ও সমাজচিন্তা
শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও বর্তমানে তিনি সিলেট আদালতে বিচারিক কাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে কর্মক্ষেত্রের এই চেনা গণ্ডির বাইরে তাঁর আরেকটি বড় পরিচয়—তিনি একজন খাঁটি ভ্রমণপিপাসু ও সমাজসেবক। ভ্রমণ ও লেখালেখি যাঁর আত্মার খোরাক, তিনি ইতিমধ্যেই ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ চষে বেড়িয়েছেন।
বিজ্ঞাপনমুক্ত সমাজ গঠনে ও সাংস্কৃতিক বিকাশে তিনি যুক্ত রয়েছেন নানা সংগঠনের সাথে। তিনি ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ (কেমুসাস), সিলেটের জীবন সদস্য, শাহজালাল উপশহর একাডেমির আজীবন দাতা এবং গোলাপগঞ্জ উপজেলার মছলম উদ্দিন খান একাডেমির আজীবন দাতা ও বর্তমান সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
তীক্ষ্ণ আত্মদর্শন ও লেখনীর মুনসিয়ানা
মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের অমূল্য সম্পদ হিসেবে চোখ দিয়েছেন। যা দিয়ে আমরা চারপাশটা দেখি, কিন্তু সবকিছুর অন্তর্নিহিত রূপ দেখতে পাই না। এই দর্শনপ্রজ্ঞা বা দেখার চোখ যাদের প্রখর, তাঁরাই সমাজে অনন্য। মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিন এমনই একজন তুখোড় দ্রষ্টা। নিজের সূক্ষ্ম দৃষ্টি ও দর্শনক্ষমতা তাঁকে সমকালীন কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক হিসেবে এক লব্ধপ্রতিষ্ঠিত মর্যাদা এনে দিয়েছে।
ধর্ম ও বিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয়কে সাধারণ পাঠকের বোধগম্য করে তুলতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। তিনি যখন কোনো ভ্রমণকাহিনী লেখেন, তা কেবল পথের বিবরণ থাকে না; বরং হয়ে ওঠে এক জীবন্ত উপাখ্যান। তিনি একজন খাঁটি আত্মদর্শনপ্রাণ লেখক, যিনি নিজের আত্মদৃষ্টিতে সমাজকে দেখেন, বিশ্লেষণ করেন এবং নিজস্ব সিদ্ধান্ত পাঠকের সামনে সহজ ভাষায় তুলে ধরেন। ইতিমধ্যেই প্রকাশিত তাঁর তিনটি গ্রন্থ পাঠক মহলে বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছে।
এক নজরে লেখকের গ্রন্থপঞ্জি:
প্রথম গ্রন্থ: ‘ভ্রমণ ও দর্শন’ (ভ্রমণ ও আত্মদর্শনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন),দ্বিতীয় গ্রন্থ: ‘সমকালীন প্রবন্ধ’ (সামাজিক অসঙ্গতি ও উত্তরণের পথ),‘সমকালীন প্রবন্ধ’: সমাজ বদলের ইশতেহার।
মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিনের দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘সমকালীন প্রবন্ধ’ মূলত সমকালের এক নিখুঁত দর্পণ। এই গ্রন্থে তিনি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা নানা সংগতি-অসংগতি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রের অরাজকতা, নিত্যপণ্যের লাগামহীন বাজার ব্যবস্থা, খাদ্যে ভেজাল এবং সাধারণ মানুষের পকেট কেটে স্বাস্থ্য খাতকে যেভাবে চড়ামূল্যের ব্যবসাকেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে—তার নির্মম চিত্র ফুটে উঠেছে এই বইয়ে।
বইটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো লেখকের লেখনী শৈলী বা স্টাইল। তিনি কেবল সমস্যার কথা বলেই ক্ষান্ত হননি; বরং: প্রথমে সমস্যাকে গভীরভাবে অবলোকন করেছেন তারপর সেই সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন। সবশেষে তিনি এর থেকে মুক্তির উপায় ও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
চলমান সমাজের অনৈতিকতার তীব্র স্রোতে যেভাবে আজকের যুবসমাজ ও মেধা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তা থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করার বাস্তবসম্মত পন্থা তিনি বাতলে দিয়েছেন। এই গ্রন্থটি পাঠ করলে যেকোনো পাঠক আত্মসচেতন হয়ে উঠবেন এবং নিজের করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
শেষ কথা
মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিনের ‘সমকালীন প্রবন্ধ’ গ্রন্থটি পাঠকের দিব্যদৃষ্টিকে আরও প্রসারিত করবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। একজন কর্মব্যস্ত মানুষ হয়েও যেভাবে তিনি ক্লান্তিহীনভাবে সাহিত্যের আঙিনায় আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন, তা এককথায় অনন্য। সমাজ ও মানুষের কল্যাণে তাঁর এই লেখনীর যাত্রা অব্যাহত থাকুক এবং তাঁর সৃষ্টিশীল কাজের বহুল প্রচার ও প্রসার ঘটুক—এটাই সমকালের প্রত্যাশা।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: