সিলেটে ইউরোপ পাঠানোর নামে প্রতারণা: ছাত্রদল নেতা ইমনের পাসপোর্ট ব্লক
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে সিলেটে প্রায় ৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ‘অ্যামেক্স অ্যাসোসিয়েটস’ নামের একটি কনসালট্যান্সি ফার্মের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের টাকা হাতিয়ে নিয়ে গত ১৯ মে থেকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় তালাবদ্ধ করে গা-ঢাকা দিয়েছেন এর দুই কর্ণধার।
অভিযুক্ত ব্যক্তিদের একজন মহানগর ছাত্রদলের সদস্য ইমন উদ্দিনের পাসপোর্ট ইতিমধ্যে ব্লক করেছে পুলিশ। তিনি সম্প্রতি দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছিলেন বলে পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। এই জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত অপর প্রধান ব্যক্তি হলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুব সংগঠন জাতীয় যুবশক্তির সিলেট জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক জাবের আহমদ।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গত বছরের শেষ দিক থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে চটকদার বিজ্ঞাপন ও ভুয়া ভিসার ভিডিও প্রচার করে ফাঁদ পাতে প্রতিষ্ঠানটি। রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিচিতি ব্যবহার করে প্রায় ৭০০ তরুণের কাছ থেকে ১ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম নেওয়া হয়। টাকা ফেরত চাইলে উল্টো মামলা ও রাজনৈতিক ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেট নগরের উপশহরের সি-ব্লকের ৩৭ নম্বর সড়কের ৪/এ নম্বর বাড়িতে ‘অ্যামেক্স অ্যাসোসিয়েটস’-এর মূল কার্যালয়। বিশ্বস্ততা অর্জনের জন্য নগরীর অন্য এলাকায় ‘ফ্যামেক্স’ ও ‘ট্যাক্সকম’ নামে আরও দুটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান খোলেন জাবের ও ইমন। ২০২৪ সালের শেষ দিকে তারা ফেসবুকে ইউরোপ ও কানাডায় লোক পাঠানোর নামে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করেন। বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে কিছু ভুয়া ব্যক্তিকে ‘ভিসা পেয়েছেন’ দাবি করে ভিডিও তৈরি ও ফটোসেশনও করা হয়।
ভুক্তভোগীদের তথ্যমতে, গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পর্তুগাল ও কানাডায় লোক পাঠানোর নামে ফাইলের স্তূপ জমা করেন জাবের ও ইমন। জাবের বিয়ানীবাজারের চান্দগ্রামের এবং ইমন কামারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা। ফাইল জমা নেওয়ার সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতে জাবের এনসিপি এবং ইমন বিএনপি ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিজেদের ছবি ব্যবহার করতেন। পর্তুগালের জন্য ১ লাখ এবং কানাডার জন্য দেড় থেকে দুই লাখ টাকা অগ্রিম নেওয়া হতো। চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে ভিসা দেওয়ার কথা থাকলেও বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর ভুক্তভোগীরা টাকা ফেরত চাইলে শুরু হয় হয়রানি।
প্রতারণার বিষয়টি ব্যাপকভাবে জানাজানি হলে গত ১৯ মে কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে নিখোঁজ হন জাবের ও ইমন। একই সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজটিও। ওই দিন রাতেই ৩০ থেকে ৪০ জন ভুক্তভোগী নগরীর কুমারপাড়ায় প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর বাসভবনে গিয়ে ভিড় করেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনারকে বিষয়টি খতিয়ে দেখে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
এরপর সিলেটের হরিপুর এলাকার বাসিন্দা নিয়াজুর রহমান বাদী হয়ে শাহপরাণ (রহ.) থানায় জাবের ও ইমনসহ সাতজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে অন্তত ৭ কোটি টাকা আত্মসাতের উল্লেখ করা হয়। মামলার পর অভিযান চালিয়ে পুলিশ ইতিমধ্যে এই চক্রের দুজনকে আটক করেছে।
এদিকে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী আহসান বলেন, “ইমন উদ্দিন নামের ওই ব্যক্তি দলের কেউ নন। নেতাদের সাথে ছবি তুলে কেউ যদি অপকর্ম করে, তবে তার ব্যক্তিগত দায় দল নেবে না।”
অন্যদিকে, জেলা এনসিপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও অভিযোগের কারণে জাবের আহমদকে বেশ কিছুদিন আগেই সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, “বিদেশে লোক পাঠানোর নামে যারা সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করেছে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। জড়িতরা পুলিশের কঠোর নজরদারিতে আছে। মামলার পর এরই মধ্যে দুজনকে আটক করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।”
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: