সখিনা বিবিদের ঈদ
"বাজান, আল্লাহ তুমার ভালো করবা, দোয়া করলাম’
"আমরার কুনো ঈদ নাই বাবা। ঈদের দিন মাইনষের বাড়ি বাড়ি ঘুইর্যা যা পাই, তা-ই কোনোমতে রান্ধিয়া খাই। ইতা দুইপরর পর থাকিয়া হন্যে অইয়া ঘুইর্যা এই কয়েক টুকরা পাইছি। যারা কোরবানি দিছইন, তারার অনেকেই গোস্ত না দিয়া দূর দূর করি খেদাইয়া দেইন। কেউ একজন পায়ের একটু টুরহা, আর কয়জন লতরা-ভতরা (অপ্রয়োজনীয় অংশ) দিয়া বিদায় করি দিছইন। এমনে এক টুরহা এক টুরহা করি দিলে কইন চাইন বাবা, গরিবের ডেকচিও কিতা ভরে?"
ঈদুল আজহার দিন সন্ধ্যার ঠিক আগে, যখন সিলেটের আকাশ জুড়ে গোধূলির আলো নিভে আসছিল, তখন নগরীর বন্দরবাজারের একটি বিপণিবিতানের সামনে মাংসের পুটুলি আগলে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন ষাটোর্ধ্ব সখিনা বিবি। চারিদিকে যখন ঈদের আনন্দ, আলোকসজ্জা আর কোরবানির তৃপ্তির ঢেকুর—তখন সখিনা বিবির এই বুকফাটা আর্তনাদ সুরমা নদীর ঢেউয়ের মতোই ভারী করে তুলছিল সিলেটের বাতাস।
সখিনা বিবির মূল বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার চণ্ডীপাশা ইউনিয়নের ধুরুয়া গ্রামে হলেও, গত কয়েক দশক ধরে তিনি ঠাঁই নিয়েছেন সিলেটের দক্ষিন সুরমার একটি বস্তিতে। স্বামী সইরত আলী মারা গেছেন প্রায় ৩০ বছর আগে। নিজের বলতে কোনো ভিটামাটি নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে অন্যের আশ্রয়ে। সরকারের সামান্য বিধবা ভাতার টাকায় কোনোমতে আধপেটা খেয়ে বেঁচে আছেন এই বৃদ্ধা।
সংসার বলতে দুটো ছেলে ছিল, যার মধ্যে এক ছেলে অকালেই প্রাণ হারিয়েছে। অন্য ছেলেটি বিয়ে করে আলাদা সংসার পেতেছে। অভাবের তাড়নায় সেই ছেলেও এখন মায়ের খবর নেয় না। "ছেলে দেখাশোনা করে না কেন?"—এ প্রশ্ন করতেই সখিনা বিবির চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল।
আঁচলে চোখ মুছে সিলেটের আঞ্চলিক টানে বললেন---তারার নিজের সংসার চালাইতেই হাহাকার, আমারে কিতা খাওয়াইবো! একটা এতিম নাতি আমার লগে থাকে, তার মুখের দিকে চাহিয়া এই বুড়া বয়সেও হাত পাতন লাগে। আর তো কয়টা দিন বাবা, এরপরে তো আমিও দুনিয়াত থাকতাম না...
ঈদের দিন সকাল থেকেই সখিনা বিবি ঝুড়ি হাতে বের হয়েছিলেন সিলেটের অভিজাত এলাকাগুলোর বাড়ি বাড়ি। স্বপ্ন ছিল, কোরবানির ঈদে অন্তত নাতিটাকে পেট পুরে মাংস-ভাত খাওয়াবেন। কিন্তু উৎসবের ঝলমলে আলোর নিচে লুকিয়ে থাকা এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। অনেক বড় বড় অট্টালিকার দুয়ার থেকে তাকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, অনেকে আবার মুখের ওপর কবাট বন্ধ করে দিয়েছেন। দিনশেষে কপালে জুটেছে কেবল ফেলে দেওয়া চর্বি আর হাড়ের টুকরো।
সখিনা বিবির এই অবহেলা ও বঞ্চনার গল্প কেবল তার একার নয়; এটি ঈদের দিনে আমাদের সমাজের তীব্র বৈষম্যের এক জীবন্ত দলিল। যেখানে একদল মানুষ কোরবানির মর্মার্থ ভুলে লোকদেখানো উৎসবে মত্ত, সেখানে অন্যদল এক টুকরো মাংসের জন্য ধুঁকে ধুঁকে কাঁদে।
প্রতিবেদনের শেষলগ্নে, এই প্রতিনিধির পক্ষ থেকে সখিনা বিবিকে সামান্য আর্থিক সাহায্য এবং একটি নতুন শাড়ির ব্যবস্থা করে দেওয়া হলে, ক্ষণিকের জন্য তাঁর মলিন মুখে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে ওঠে। নাতিকে নিয়ে ঘরে ফেরার জন্য যখন তিনি গাড়িতে উঠছিলেন, তখন হাত তুলে ছলছল চোখে একরাশ আবেগ নিয়ে বললেন-- "বাজান, আল্লাহ তুমার ভালো করবা। তুমার লাগি মন থাকি দোয়া করলাম।"
গাড়িটি সিলেটের ব্যস্ত রাস্তা ধরে চলে গেল, কিন্তু সখিনা বিবির সেই আকুল প্রশ্নটি যেন শহরের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল—"যারা কোরবানি দিছইন, তারার অনেকেই গোস্ত না দিয়া খেদাইয়া দেইন... গরিবের লাগি কিতা কুনো ঈদ নাই?"
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: