সুনামগঞ্জে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত: হাওর ও নদী রক্ষায় ১০ দফা দাবি
জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র ঝুঁকি মোকাবিলা এবং হাওরাঞ্চলের বিপন্ন পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার আহ্বান জানিয়ে সুনামগঞ্জে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ উদযাপিত হয়েছে। ‘জলবায়ু পরিবর্তন: আজকের পদক্ষেপ, আগামীর নিরাপত্তা’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ শুক্রবার (৫ জুন) সকালে শহরের ট্রাফিক পয়েন্ট সংলগ্ন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এক নাগরিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
‘হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জ’ এবং ‘এসভিডিএস’ যৌথভাবে এই কর্মসূচির আয়োজন করে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘এএলআরডি’-এর সহযোগিতায় সমাবেশ শেষে জনসাধারণের মাঝে ফলদ ও বনজ বৃক্ষ বিতরণ করা হয়।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মো. রাজু আহমেদের সভাপতিত্বে এবং সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও এসভিডিএস-এর নির্বাহী পরিচালক মোঃ ওবায়দুল হক মিলনের সঞ্চালনায় সমাবেশে মূল ধারণা পত্র পাঠ করেন সহ-সভাপতি ওবায়দুল মুন্সী।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ১৯৭৪ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হলেও অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। বিশেষ করে হাওরাঞ্চল এখন চরম হুমকির মুখে। ঘনঘন অকাল বন্যা, তীব্র খরা, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস আমাদের অর্থনীতি ও প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। সংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে পরিবেশবান্ধব গবেষণা, জলবায়ু-সহিষ্ণু টেকসই কৃষি ব্যবস্থা এবং বিশেষ তহবিল বরাদ্দের দাবি জানান তারা।
সমাবেশে নাগরিক সমাজের পক্ষে ১০টি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেন মোঃ ওবায়দুল হক মিলন। দাবিগুলো হলো: ১. নদীকে সম্পূর্ণ দূষণ ও দখলমুক্ত করা এবং বন উজাড় বন্ধ করা। ২. হাওর-জলাভূমি সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ৩. শিল্প বর্জ্য এবং প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইনি পদক্ষেপ। ৪. পানি সংরক্ষণ ও পানির পুনঃব্যবহার নিশ্চিতসহ জলবায়ু সহনশীল কৃষির প্রচলন। ৫. উপকূলীয় ম্যাংগ্রোভ বনসহ দেশের সব ধরনের বন সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ। ৬. যাদুকাটা, ধোপাজান, চেলা ও খাসিয়ামারাসহ সুনামগঞ্জের নদীগুলোতে পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করা। ৭. জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ৮. রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরসহ সকল হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কঠোর নজরদারি। ৯. পর্যটন এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ১০. হাওরাঞ্চলের জন্য যুগোপযোগী ‘ইকো-ট্যুরিজম’ বা পরিবেশবান্ধব পর্যটন নীতিমালা প্রণয়ন।
সভাপতির বক্তব্যে মো. রাজু আহমেদ বলেন, “সুনামগঞ্জের হাওর ও নদী কেবল আমাদের সম্পদ নয়, এটি দেশের ফুসফুস। পর্যটন ও উন্নয়নের নামে এই প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম ধ্বংস করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।” তিনি সরকারকে এই ১০ দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সহ-সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম মজনু, শাহ কামাল, সুহেল আলম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাইনুদ্দীন, আকিক মিয়া, ফজলে রাব্বি, মোশফিকুর রহমান, সমাজসেবক মনসুর আলম, নুরুল হাসান আতাহার, সুরঞ্জিত গুপ্ত রঞ্জনু, দ্বিপাল ভট্টাচার্য এবং শান্তিগঞ্জ উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব আহমদ উসমান প্রমুখ। আলোচনা সভা শেষে শহরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে পরিবেশ উন্নয়নের প্রত্যয়ে শত শত গাছের চারা বিতরণ করা হয়।
প্রীতম দাস/ ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: