তাহিরপুরে আট বছরের শিশুকে পালাক্রমে ধর্ষণের অভিযোগে দুই কিশোর আটক
সুনামগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী তাহিরপুর উপজেলায় ৮ বছরের এক হতদরিদ্র এতিম শিশুকে বাড়িতে একা পেয়ে জোরপূর্বক পালাক্রমে ধর্ষণের লোমহর্ষক ও বর্বরোচিত ঘটনায় জড়িত অভিযুক্ত দুই কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ। গত ৪ জুন বৃহস্পতিবার বিকালের দিকে উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের সীমান্ত লাগোয়া কলাগাঁও গ্রামে এই পাশবিক ঘটনাটি ঘটে।
তবে অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক বিষয় হলো, ধর্ষণের এই ঘটনাটি জানাজানির পর থেকেই লোকলজ্জা ও আইনি জটিলতার ভয় দেখিয়ে কাউকে কিছু না জানানোর জন্য ভুক্তভোগী অবুঝ শিশুর পরিবারকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি ও চরম ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছিল বলে সরাসরি অভিযোগ উঠেছে অভিযুক্তদের প্রভাবশালী পরিবারের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, ধর্ষণের পর থেকে ভুক্তভোগী শিশুটির শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হলেও তাকে উন্নত ও জরুরি চিকিৎসার জন্য জেলা হাসপাতালে নিয়ে যেতেও অবরুদ্ধ করে বাধা দিচ্ছিল ধর্ষণকারী ওই দুই কিশোরের পরিবারের প্রভাবশালী লোকজন।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্র থেকে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার বিকালের দিকে উপজেলার কলাগাঁও গ্রামের আল আমিনের বখাটে ছেলে সাকিব মিয়া (১৪) এবং রনি মিয়ার ছেলে রিসাল মিয়া (১৪) নামের দুই কিশোর হতদরিদ্র ওই শিশুটিকে তার বাড়িতে সম্পূর্ণ একা পেয়ে মুখে চেপে ধরে জোরপূর্বক বাড়ির পেছনে থাকা একটি নোংরা টয়লেটে নিয়ে যায় এবং সেখানে তাকে পালাক্রমে পাশবিক ধর্ষণ করে; এ সময় অতিরিক্ত পাশবিকতার কারণে শিশুটির শরীর থেকে তীব্র রক্তক্ষরণ শুরু হলে অবস্থা বেগতিক দেখে ধর্ষণকারী দুই কিশোর অবুঝ শিশুটিকে রক্তাক্ত অবস্থায় ওই টয়লেটের ভেতরেই ফেলে রেখে সুকৌশলে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে গুরুতর আহত অবস্থায় ধর্ষণের পুরো ঘটনাটি শিশুটির নানী ও পরিবার জানার পর, আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে ধর্ষণকারীদের পরিবারের লোকজন গোপনে শিশুটিকে কোনো নামধারী ডাক্তার ছাড়া স্থানীয়ভাবে কবিরাজি চিকিৎসা দেয় এবং মোটা অঙ্কের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে পুরো জঘন্য বিষয়টি সামাজিকভাবে ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়। আজ শনিবার দুপুরে এ বিষয়ে ভুক্তভোগী অসহায় শিশুটির আপন নানীর কান্নাজড়িত একটি আকুতিভরা ভিডিও বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কিছু সচেতন যুবকের মাধ্যমে পোস্ট করার পর তা মুহূর্তের মধ্যেই পুরো সুনামগঞ্জ জেলাজুড়ে ভাইরাল হয়ে যায়। যার ফলে টনক নড়ে স্থানীয় প্রশাসনের। এর সত্যতা নিশ্চিত করতে উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের কলাগাঁও গ্রামের স্থানীয় ইউপি সদস্য (মেম্বার) আব্দুর রশিদ দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “গত তিন-চার দিন আগে এই জঘন্য ঘটনাটি ঘটেছে বলে ভুক্তভোগী শিশুটির নানী কান্না করতে করতে আমাকে নিজে জানিয়েছে; তবে দুঃখের বিষয় হলো এখানে ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত ছেলে-মেয়ে সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক।”
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে ও পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে লাঞ্ছিত ধর্ষিতা শিশুটির নানী কান্নাজড়িত কণ্ঠে ক্ষোভ ও বিচার চেয়ে জানান, “এর আগেও গত অগ্রহায়ণ মাসে আমি কোনো এক প্রয়োজনে বাড়িতে না থাকার সুবাদে এই কলাগাঁও গ্রামের আল আমিনের ছেলে সাকিব মিয়া ও রনির ছেলে রিসাল মিয়া আমার এই পিতৃহীন এতিম নাতনিকে জোর করে প্রথম বার ধর্ষণ করেছিল; তখন তারা এই ঘটনা কাউকে বললে আমাদের জানমালের ক্ষতি করবে বলে হুমকি দিয়েছিল। হেরা (তারা) এলাকায় অনেক শক্তিশালী ও প্রভাবশালী মানুষ, আমরা অত্যন্ত গরিব মানুষ, তাই লোকলজ্জা আর ভয়ে তখন কাউরে কিছু বলি নাই; এখন আবার গত বৃহস্পতিবার আসরের নামাজের পরে আমার নাতনিরে বাড়িতে একলা পাইয়া এই পোলারা (সাকিব ও রিসাল) জোর কইরা টাইন্না নিয়া ল্যাপ্টিনে (টয়লেটে) ঢুকাইয়া জোরপূর্বক ধর্ষণ করছে; আমরা সমাজ ও প্রশাসনের কাছে এই নরপশুদের উপযুক্ত ও সুষ্ঠু বিচার চাই।”
এ বিষয়ে জানতে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুর ইসলাম ঘটনার সত্যতা ও পুলিশের দ্রুত অ্যাকশনের কথা নিশ্চিত করে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে গণমাধ্যমকে বলেন, “ফেসবুকের ভিডিও ও স্থানীয় মারফত এই স্পর্শকাতর ধর্ষণের বিষয়টি শোনামাত্রই আমি নিজে সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে ছুটে যাই এবং কলাগাঁও গ্রামে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত দুই কিশোর আসামিকে হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হই; বর্তমানে ভুক্তভোগী শিশুটির দ্রুত সুচিকিৎসা ও ডাক্তারি পরীক্ষার (মেডিকেল টেস্ট) জন্য তাকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানোর পাশাপাশি ধৃত দুই আসামিকে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানোর কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে চলমান রয়েছে।”
শামছুল আলম আখঞ্জী/এআর
মন্তব্য করুন: