চলতি বছরের সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড
সিলেটে মে মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫১ জনের প্রাণহানি:
সিলেট বিভাগের চার জেলায় বিদায়ী মে মাসে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও এর ফলে সৃষ্ট প্রাণহানির হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে; মে মাসে পুরো বিভাগজুড়ে সড়ক মহাসড়কের বুকে ঝরে গেছে অন্তত ৫১ জন তরতাজা মানুষের প্রাণ। দেশের অন্যতম শীর্ষ সামাজিক সংগঠন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) সিলেট বিভাগীয় কমিটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিশেষ বার্ষিক পরিসংখ্যান ও গবেষণা প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
আজ শনিবার (৬ জুন) সংগঠনটির সিলেট জেলা ও বিভাগীয় কমিটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে এই প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। নিসচার সংগৃহীত তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মে মাসে সিলেট বিভাগের চার জেলায় মোট ৪২টি পৃথক ও ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে; এসব লোমহর্ষক দুর্ঘটনায় ৫১ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন আরও অন্তত ৬৫ জন গুরুতর আহত যাত্রী ও চালক। প্রকাশিত প্রতিবেদনে অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে উল্লেখ করা হয় যে, নিহতদের মধ্যে মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহীদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি এবং আশঙ্কাজনক; যার মধ্যে কেবল ২০ জনই ছিলেন মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী তরুণ। এছাড়া মে মাসে মুসলিম উম্মাহর বড় ধর্মীয় উৎসবের ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে মহাসড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে ৯টি বড় সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বিশেষ খণ্ড আকারে উল্লেখ করা হয়, যা চলতি ২০২৬ সালের বিগত পাঁচ মাসের মধ্যে একক কোনো মাসে সিলেটে সর্বোচ্চ সড়ক মৃত্যুর এক কালো ও ভয়াবহ রেকর্ড।
নিসচার জেলাভিত্তিক নিখুঁত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে মে মাসে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে প্রধান জেলা সিলেটে; আর ভৌগোলিক ও তুলনামূলকভাবে মে মাসে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে মৌলভীবাজার জেলায়। সমীকরণ অনুযায়ী, মে মাসে সিলেট জেলায় ১৭টি পৃথক দুর্ঘটনায় সর্বোচ্চ ২১ জন নিহত ও ৪০ জন আহত হয়েছেন; হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জ জেলায় ১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত ও ২০ জন আহত হন। এছাড়া চা বাগানসমৃদ্ধ হবিগঞ্জ জেলায় সাতটি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ৩ জন আহত এবং সবুজ জেলা মৌলভীবাজারের আঞ্চলিক সড়কে ৫টি দুর্ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২ জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে নিসচার রিপোর্টে নিশ্চিত করা হয়েছে। লিঙ্গ ও বয়স ভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়, মৃত ৫১ জন দুর্ভাগা মানুষের মধ্যে ৩৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ, ৬ জন নারী এবং ৬ জন নিষ্পাপ শিশু রয়েছে; এর মধ্যে স্পট ডেথ ও হাসপাতালে মারা যাওয়া ২০ জন মোটরসাইকেল আরোহী ছাড়াও লোকাল গণপরিবহন হিসেবে পরিচিত থ্রি-হুইলার সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত টমটমের ১১ জন সাধারণ যাত্রী ও চালক, দূরপাল্লার বাস-ট্রাকসহ অন্যান্য বড় যানবাহনের ১৮ জন চালক এবং রাস্তা পারাপারের সময় অসাবধানতাবশত ৯ জন সাধারণ পথচারী নিহত হয়েছেন। নিসচার অনুসন্ধান সেল জানিয়েছে, মে মাসে সংঘটিত অধিকাংশ দুর্ঘটনাই মূলত চালকদের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি উল্টে যাওয়া, বিপরীতমুখী গাড়ির সাথে সরাসরি মুখোমুখি সংঘর্ষ এবং সড়কের মোড় ও অবকাঠামোগত ত্রুটির কারণে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি ঘটেছে।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সিলেট বিভাগীয় কমিটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, মে মাসে বিভাগে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর হার জ্যামিতিক হারে বেশি বাড়ার পেছনে চালকদের মধ্যে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক নিয়ম না মেনে যত্রতত্র বিপজ্জনক ওভারটেকিং, দ্রুতগতির মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের সিংহভাগেরই মানসম্মত ও সার্টিফাইড হেলমেট ব্যবহার না করা, মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে পথচারীদের অসচেতনভাবে রাস্তা পার হওয়া এবং মহাসড়কের মারাত্মক নকশাগত বা ইঞ্জিনিয়ারিং ত্রুটি প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে বলে নিসচার সুপারিশে কঠোরভাবে উল্লেখ করা হয়। নিসচার তুলনামূলক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মে মাসের এই ভয়াবহ চিত্রের বিপরীতে এর আগের মাস অর্থাৎ গত এপ্রিল মাসে সিলেট বিভাগে ১৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় তুলনামূলক অনেক কম অর্থাৎ ১৫ জন নিহত এবং ৫৮ জন আহত হয়েছিলেন; অর্থাৎ এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে এসে সিলেটে সড়ক মৃত্যুর হার তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রশাসনের ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও চালকদের লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় কঠোর নজরদারি বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছেন নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কর্মীরা।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: