সুনামগঞ্জ শহরে চারলেন প্রকল্প শৃঙ্খলিত: পুরো সড়ক জুড়ে ‘মরণফাঁদ’

বৈদ্যুতিক খুঁটি অপসারণে ধীরগতি

সুনামগঞ্জ শহরে চারলেন প্রকল্প শৃঙ্খলিত: পুরো সড়ক জুড়ে ‘মরণফাঁদ’

প্রথম ডেস্ক

০৭/০৬/২০২৬ ১৩:৫৬:১৮

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জ জেলা শহরের দীর্ঘদিনের তীব্র যানজট স্থায়ীভাবে নিরসন ও শহরকে আধুনিকায়নের মহাপরিকল্পনা নিয়ে মহাসড়কে শুরু হওয়া মেগা চারলেন সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে ও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগোচ্ছে; প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরু থেকেই জমি অধিগ্রহণসহ নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় রাজপথের কাজ ব্যাহত হলেও বর্তমানে এই মেগা প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ও বিপজ্জনক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সড়কের দুই পাশে বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শতশত হাইভোল্টেজ বৈদ্যুতিক খুঁটি।

সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ ও নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, প্রায় ১৪৪ কোটি টাকা বিশাল ব্যয়ে দুই বছর মেয়াদি এই অতিগুরুত্বপূর্ণ চারলেন সড়ক প্রকল্পটি দরপত্রের মাধ্যমে যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে দেশের অন্যতম শীর্ষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এমএম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স’; চলতি ২০২৬ সালের প্রথমার্ধেই এই মেগা প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ দৃশ্যমানভাবে শুরু হলেও আগামী ২০২৭ সালের জুন মাসের মধ্যে চারলেনের কাজ শতভাগ বুঝিয়ে দেওয়ার যে সরকারি কঠোর সময়সীমা বা ডেডলাইন রয়েছে, বিদ্যুৎ বিভাগের চরম অবহেলার কারণে তা নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হওয়া নিয়ে বর্তমানে এক বিশাল বড় অনিশ্চয়তা ও ধোঁয়াশা দেখা দিয়েছে। সওজ কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানিয়েছে, শহরের প্রধান সড়কটি প্রশস্ত করার স্বার্থে অবরুদ্ধ বৈদ্যুতিক খুঁটিগুলো দ্রুত ও নিরাপদে নিরাপদ দূরত্বে স্থানান্তরের জন্য তারা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) স্পট প্রাক্কলন অনুযায়ী নগদ ৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা সম্পূর্ণ পরিশোধ করেছে; তবে সরকারি কোষাগার থেকে এই বিশাল অঙ্কের টাকা কয়েক মাস আগে বিদ্যুৎ বিভাগের পকেটে গেলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এখনো সড়কের প্রায় ৭০ শতাংশ বৈদ্যুতিক খুঁটি আগের অবস্থানেই অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা সড়ক বিভাগের প্রকৌশলীদের স্তম্ভিত করেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের এমন চরম ধীরগতির ফলে অনন্যোপায় হয়ে চারলেন সড়কের কোথাও একদম মাঝখানে, আবার কোথাও অত্যন্ত বিপজ্জনক অন্ধ মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই লাইভ বৈদ্যুতিক খুঁটিগুলোকে সম্পূর্ণ রেখেই ও পাশ কাটিয়েই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য হয়ে পিচঢালাই, কার্পেটিং ও অন্যান্য অপরিহার্য নির্মাণকাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে; যার ফলে চারলেনের আধুনিক এই প্রধান সড়কটি এখন সাধারণ যাত্রী ও যানবাহন চালকদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রাতের কুয়াশা বা অন্ধকারে দ্রুতগতির দূরপাল্লার বাস ও মালবাহী ট্রাকগুলো এই মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা খুঁটিগুলোর কারণে প্রতিনিয়ত মারাত্মক দুর্ঘটনার আশঙ্কার মধ্যে চলাচল করছে, যার ফলে সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই বৈদ্যুতিক খুঁটিগুলো এখন সুনামগঞ্জ শহরবাসীর কাছে আক্ষরিক অর্থেই একেকটি জীবন্ত ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের তদারকি সূত্র জানায়, চারলেনের স্বার্থে এই খুঁটি স্থানান্তরের কাজ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার আইনি কথা থাকলেও বিদ্যুৎ বিভাগের নিয়োজিত সাব-ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম গাফিলতির কারণে সড়কের মূল সিসি ও আরসিসি (RCC) ঢালাইয়ের মতো ভারী স্ট্রাকচারাল কাজগুলোও এখন মারাত্মকভাবে ব্যাহত ও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এদিকে জেলা শহরের বুক চিরে চলা প্রধান এই সড়কের নির্মাণকাজের এমন হতাশাজনক কচ্ছপগতির কারণে শহরের আলফাত স্কয়ার, ট্রাফিক পয়েন্টসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে প্রতিদিনই দীর্ঘ ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন অতিষ্ঠ শহরবাসী; এর পাশাপাশি সড়কের অসম্পূর্ণ পিচঢালাই, দুপাশে মাটি ভরাটের বাকি কাজ, প্রভাবশালীদের অবৈধ ফুটপাত দখল এবং ঠিকাদারের অবহেলায় সড়কের যত্রতত্র ফেলে রাখা স্তূপীকৃত নির্মাণসামগ্রীর ধুলোবালিতে জনভোগান্তি ও সাধারণ মানুষের শ্বাসকষ্টের ভোগান্তি এখন চরমে পৌঁছেছে। শহরের প্রাণকেন্দ্র উকিলপাড়ার সচেতন স্থায়ী বাসিন্দা নূরুল হাসান আতাহের চলমান চারলেন প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর হতাশা প্রকাশ করে এই প্রতিবেদককে বলেন, “সুনামগঞ্জ শহরের ভোল বদলে দেওয়ার জন্য এই চারলেন সড়কটি আমাদের স্বপ্নের প্রকল্প ছিল, কিন্তু এর কাজের অগ্রগতি অত্যন্ত হতাশাজনক ও প্রশ্নবিদ্ধ; চারলেনের পিচঢালাই হয়ে যাচ্ছে অথচ এখনো বিপজ্জনক বৈদ্যুতিক খুঁটিগুলো রাস্তার মাঝখান থেকে অপসারণ করা হয়নি, অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্পটে মাটি ভরাটের কাজও মাসের পর মাস বাকি পড়ে আছে। কাজের এই অব্যবস্থাপনার কারণে পুরো শহরে সবসময় তীব্র যানজট লেগেই থাকে এবং ধুলোবালিতে পথ চলা যায় না; ঠিকাদার আর বিদ্যুৎ বিভাগের এই কচ্ছপগতির তামাশা এভাবে চললে নির্ধারিত আগামী বছরের জুনের মধ্যে এই মেগা প্রকল্প শেষ হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব বলে মনে হয় না।” পুরো প্রকল্পের এই অচলাবস্থা ও খুঁটি জটিলতার বিষয়ে সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আহাদ উল্লাহ বিদ্যুৎ বিভাগের ওপর দায় চাপিয়ে সরাসরি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “রাস্তার মাঝখান থেকে বিপজ্জনক খুঁটিগুলো দ্রুত স্থানান্তরের জন্য আমরা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে নিয়মিত সরকারিভাবে কড়া তাগিদ ও চিঠি দিয়ে আসছি, কিন্তু টাকা নিয়েও বিদ্যুৎ বিভাগ কাজ না করে বার বার আমাদের কাছে কেবল নতুন নতুন সময় চাইছে; এই খুঁটিগুলো সময়মতো অপসারণ না করার কারণেই মূলত পুরো প্রকল্পের কাজ দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জনদুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে। তারপরও আমরা সওজের পক্ষ থেকে আমাদের ঠিকাদারকে চাপ দিচ্ছি এবং সরকারের নির্ধারিত সময়ের আগেই যেকোনো মূল্যে এই চারলেনের কাজ শেষ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।” তবে সওজের এই তীব্র ও প্রকাশ্য অভিযোগের মুখে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করে সাফাই গেয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রাসেল আহমাদ সড়ক ও বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বয়ের কথা উল্লেখ করে আশ্বস্ত করে বলেন, “আমাদের অনুমোদিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই মাঠপর্যায়ে খুঁটি সরানোর কাজ দ্রুত গতিতে চলছে; ইতিমধ্যে সড়কের পশ্চিম পাশের খুঁটি স্থানান্তরের প্রায় ৫৩ শতাংশ কাজ অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। যেহেতু এটি একটি চলমান সচল বিদ্যুৎ লাইন, তাই হুট করে সংযোগ কাটলে শহরের দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং ও জনদুর্ভোগের বিষয়টি আমাদের মাথায় রাখতে হয়; আমরা সওজের প্রকৌশলীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় করে দ্রুত বাকি কাজ শেষ করার চেষ্টা করছি এবং আমাদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও লিখিত আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে আগামী দুই মাসের মধ্যে সড়কের পূর্ব পাশের অবশিষ্ট সমস্ত বৈদ্যুতিক খুঁটি নিরাপদ দূরত্বে স্থানান্তরের কাজ শতভাগ সম্পন্ন করা হবে।”


এ রহমান

মন্তব্য করুন: