সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বহাল, নীতি সুদহার অপরিবর্তিত
বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না নামায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বহাল রেখেছে। ফলে নীতি সুদহার (পলিসি রেট) ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান। এ সময় তিন ডেপুটি গভর্নর, প্রধান অর্থনীতিবিদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে জ্বালানির মূল্য সমন্বয়, আকস্মিক বন্যায় কৃষি উৎপাদনের ক্ষতি এবং ইরানযুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণেই নীতি সুদহার ১০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে।
আগের মুদ্রানীতিতে চলতি বছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। কিন্তু গত মে মাস পর্যন্ত এ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। তাই আগামী ডিসেম্বরের জন্য নতুন লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অন্যদিকে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য জুন পর্যন্ত ২১ দশমিক ৬০ শতাংশ থাকলেও বাস্তবে তা বেড়ে ২৫ দশমিক ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত না হওয়ায় সরকারের ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ দশমিক ৮০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী অর্থবছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ১ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। যদিও সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে মুদ্রানীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন, বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি এবং ২০২৪ সালের মাঝামাঝি শুরু হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময় মন্থর ছিল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এ হার ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এতে অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত মিললেও প্রবৃদ্ধি এখনো দুর্বল।
ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান বলেন, সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়ক পদক্ষেপের ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে বাড়বে। অর্থবছর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
নতুন মুদ্রানীতিতে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যও কমানো হয়েছে। গত জুন পর্যন্ত এ লক্ষ্য ছিল ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ, কিন্তু বাস্তবে তা দাঁড়ায় ১২ দশমিক ১০ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এটি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যদিও বাজারে তারল্য ব্যবস্থাপনার কারণে এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মুদ্রানীতি বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতি এখনো নাজুক পুনরুদ্ধার পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় অপরিশোধিত তেল, এলএনজি ও সারের সরবরাহ ব্যাহত হলে আমদানি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ। এটি কমাতে ১৮ মাসের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথম ছয় মাসের নীতিমালা ইতোমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। আগের মতো ঋণ পুনঃতফসিলকে আর উৎসাহিত করা হবে না। এক্সিট পলিসিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে, যাতে অকার্যকর ঋণের দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হয়।
তিনি আরও বলেন, আগামী বছরে অর্থঋণ আদালত আইন ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থঋণ আদালত আইনে ঋণসংক্রান্ত মামলার বিচার সর্বোচ্চ ছয় মাসে শেষ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতে ২০২৭ সাল থেকে ব্যাংকিং খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে গভর্নর বলেন, কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিধি লঙ্ঘন হলে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগে যেখানে অনেক ক্ষেত্রে ন্যূনতম ব্যবস্থা নেওয়া হতো, এখন থেকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
মেঘনা গ্রুপের বিদেশি ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে ঋণের সুদহার ১২ থেকে ১৪ শতাংশ। কোনো উদ্যোক্তা যদি বিদেশ থেকে ৫ থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ আনতে পারেন, তাহলে সেটিকে উৎসাহিত করা হবে।
সিটি গ্রুপের দায়সংক্রান্ত বিষয়ে গভর্নর জানান, বিষয়টি নজরে আসার পর সংশ্লিষ্ট তিনটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। তারা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করছেন।
তারল্য পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংকগুলোকে ১৭ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তা বেড়ে ৫১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবে গত চার মাসে সাধারণ ব্যাংকগুলোকে নতুন করে কোনো তারল্য সহায়তা দিতে হয়নি। শুধু ইসলামী ব্যাংককে ১৩ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে এবং এ বিষয়ে সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।
গভর্নর আরও বলেন, ৫ আগস্টের পর কয়েকটি ব্যাংকের হাতে অতিরিক্ত তারল্য জমা হওয়ায় তারা অস্বাভাবিক মুনাফা করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান বা স্প্রেড সর্বোচ্চ ৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে অনেক ব্যাংকে এ ব্যবধান গড়ে ৬ শতাংশ, কোথাও কোথাও ৭ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত। স্প্রেড ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা গেলে আমানতকারীরা বেশি সুদ পাবেন এবং ঋণগ্রহীতারাও তুলনামূলক কম সুদে ঋণ নিতে পারবেন। এতে ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতা ও ভারসাম্য আরও শক্তিশালী হবে।
সজল আহমেদ
মন্তব্য করুন: