মৌলভীবাজারে ফকির আয়াজ বাঙালির জীবন চলছে চরম অবহেলায়

যার গানে তারকা বনেছেন অগনন শিল্পী

মৌলভীবাজারে ফকির আয়াজ বাঙালির জীবন চলছে চরম অবহেলায়

বিশেষ প্রতিবেদন

০৩/০৭/২০২৬ ০০:৪৩:০৩

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

"আমি জীবন থাকা অবস্থায় যদি সম্মান না পাই, তাহলে আমার মৃত্যুর পর সেই সম্মানের কোনো প্রয়োজন নেই।" এক বুক অভিমান, চরম ক্ষোভ আর বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন বাংলার মাটির গন্ধমাখা লোকসংগীতের অনন্য সাধক ফকির আয়াজ বাঙালি। প্রচারমাধ্যমের চাকচিক্য আর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার আড়ালে হারিয়ে যাওয়া মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার এই প্রতিভাবান বাউল জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন। অথচ আজ তাঁর সঙ্গী কেবলই চরম অবহেলা, অনাহার-অর্ধাহার আর বিনাচিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকার নির্মম বাস্তবতা।


সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর নির্মম পরিহাস হলো, ফকির আয়াজ বাঙালির লেখা ও সুর করা গান গেয়ে দেশের অনেক নামী-দামী শিল্পী আজ কোটি মানুষের হাততালি কুড়াচ্ছেন, পেয়েছেন তারকা খ্যাতি। কিন্তু পর্দার আড়ালে থেকে যিনি এই সুরের বীজ বুনেছিলেন, সেই মূল রূপকার আজ সমাজের এক অন্ধকার কোণে পড়ে আছেন নিদারুণ কষ্টে।


তাঁর নিজস্ব সুর ও গায়কীতে 'চৌদ্দ নম্বর বেয়াক্কল'-এর মতো কালজয়ী গান আজ দেশ-বিদেশে কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিলেও, এর আসল স্রষ্টা আজ বিস্মৃতির অতলে।


ফকির আয়াজ বাঙালি শুধু একজন সাধারণ গায়ক নন, বরং তিনি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গ্রামীণ লোকসংগীত ও সিলেটের আঞ্চলিক সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। তাঁর অবক্ষয়হীন সৃষ্টিগুলো বাংলার লোকসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে যুগের পর যুগ। তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:


## চৌদ্দ নম্বর বেয়াক্কল (তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও তুমুল সুপরিচিত গান)


## তাওয়ার মাঝে দে লাড়া (জনপ্রিয় সিলেটি আঞ্চলিক রম্য গান)


## বন্ধুর মায়া নাই রে


## তাইরে লইয়া কিলা দিন কাটাই


## দেখিছ কিতা করে গো তাই


## শাকেরার মা দেউ না তুরা ঝুল


## ফাইভের ভিতরে টেম্পু যায়নি


## কন্যা সুন্দর ভাদেশ্বর


## সরল মনে কাপড় তুলো দেখি তোমার মুখকান


## ওগো মায়া লাগাউরি


## কানারে পথ দেখানি ভালা (বাউল গান)


## সুরের মেলা মঞ্চে মঞ্চে, স্রষ্টার ঘরে শুধুই অভাব


সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধারণ করা এই গানগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে বড় বড় কনসার্টের মঞ্চে প্রতিনিয়ত পরিবেশিত হয়ে লাখ লাখ টাকা বাণিজ্য করলেও, এর মূল কারিগর আজ চরম আর্থিক সংকটের মুখোমুখি। দুঃখজনকভাবে, এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই গুণী মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি, খোঁজ নেয়নি কেউ তাঁর কপিরাইট বা রয়্যালটির।


স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীবৃন্দ গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শেকড়ের এই গুণী শিল্পীদের এমন অবমূল্যায়ন দেশের লোকসংগীতের ঐতিহ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। অন্যের কপালে জনপ্রিয়তার মুকুট পরিয়ে দেওয়া মানুষটি আজ বিনাচিকিৎসায় ধুঁকছেন। অবিলম্বে এই গুণী বাউল সাধকের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া এবং উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি।


সংস্কৃতির ধারক-বাহক এই গুণী মানুষের শেষ জীবনের এমন করুণ দশা মৌলভীবাজারসহ দেশের সাংস্কৃতিক সচেতন মহলে তীব্র বেদনা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। মৌলভীবাজারবাসীর এখন একটাই আকুল আবেদন— মৃত্যুর পর পুষ্পস্তবক কিংবা কান্নার রোল তোলার ভণ্ডামি নয়; বরং বেঁচে থাকতেই যেন এই লোকশিল্পীকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান, রয়্যালটি ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। অবিলম্বে তাঁর পাশে দাঁড়াতে সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সুধী সমাজের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে।

ডি আর ডি

মন্তব্য করুন: