পরীক্ষার হলে যাওয়ার পথেও ছেলের কানে বেজেছে ‘ইলিয়াস আলী গুম’

গুম প্রতিরোধ দিবসে স্ত্রী লুনা’র স্মৃতিচারণ

পরীক্ষার হলে যাওয়ার পথেও ছেলের কানে বেজেছে ‘ইলিয়াস আলী গুম’

মীর্জা খলিল, ঢাকা অফিস

৩১/০৮/২০২৬ ০৩:৪০:১৯

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

হকারের তীব্র কণ্ঠের চিৎকার—‘ইলিয়াস আলী গুম, ইলিয়াস আলী গুম!’ থমকে থাকা ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে গাড়ির ভেতর থেকে সেই বিভীষিকাময় হাক শুনছিল এক কিশোর। পরদিনই তার রসায়ন পরীক্ষা। বাবার ফিরে আসার আকুল আকুতি আর বুকচাপা কান্না চেপে রেখেই তাকে ঢুকতে হয়েছিল পরীক্ষার হলে।

বিএনপির নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার সেই নির্মম স্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন তাঁর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা। রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক আবেগঘন আলোচনা সভায় উঠে আসে তাঁর এই হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা।

সেই আতঙ্কময় দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে কেঁপে ওঠে তাহসিনা রুশদীর লুনার কণ্ঠ। তিনি বলেন, “আমার স্বামী যখন গুম হন, বড় ছেলের তখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা চলছিল। ১৭ এপ্রিলের পরদিন ১৮ তারিখ ওর কেমিস্ট্রি পরীক্ষা ছিল। মানসিকভাবে বিপর্যয়কর সেই অবস্থাতেও ছেলেকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি থামতেই হকারের মুখে ‘ইলিয়াস আলী গুম’ শুনতে শুনতে ছেলেকে পরীক্ষার হলে ঢুকতে হয়েছে।”

শুধু বড় ছেলেই নয়, গুমের সেই অদৃশ্য ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয়েছে তাঁর ছোট মেয়েটিকেও। স্কুলে সহপাঠীদের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্ন, করুণা আর হাসাহাসির মুখোমুখি হতে হতে একপর্যায়ে স্কুলই বদলে ফেলতে বাধ্য হয় শিশুটি। তাহসিনা রুশদীর বলেন, “পরবর্তী সময়ে সন্তানদের মিডিয়ার সামনে আনা বন্ধ করে দিই। একটা অস্বাভাবিক আর চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে ওদের বড় হতে হয়েছে।”

গুম কেবল একজন মানুষকে কেড়ে নেয় না, একটি পুরো পরিবারকে কীভাবে তিল তিল করে শেষ করে দেয়—সেই যন্ত্রণার কথা তুলে ধরে লুনা বলেন, “আমরা যেখানেই যাই না কেন, সারাক্ষণ মনের ভেতর এই পাথরটা চেপে থাকে যে আমাদের পরিবারের সদস্য গুম হয়েছে। এর থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই। বিগত সরকারের আমলে পরিস্থিতি এমন তৈরি করা হয়েছিল যেন গুম হওয়া পরিবারগুলোই অপরাধী!”

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, “আন্তর্জাতিকভাবে নানা সন্ত্রাসী বাহিনী মানুষকে তুলে নেয়। কিন্তু বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও মদদে সরকারি বাহিনীকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক বিরোধী দলকে দমনে গুমের সংস্কৃতি শুরু করা হয়েছিল।”

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সভাপতিত্বে উক্ত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। সভায় স্বজনহারা আরও বহু পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত হয়ে প্রিয়জনদের হারিয়ে যাওয়ার মর্মন্তুদ করুণ গল্প তুলে ধরেন এবং প্রতিটি গুমের ঘটনার নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি জানান।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল গভীর রাতে রাজধানীর বনানী থেকে গাড়িচালকসহ নিখোঁজ হন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও আজও মেলেনি তাঁর কোনো সন্ধান।

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad