আবাসস্থল ও খাদ্যসংকট: শ্রীমঙ্গলে এক মাসে উদ্ধার ২২ বন্যপ্রাণী
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বিদায়ী আগস্ট মাসজুড়ে একের পর এক বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসার ঘটনা ঘটেছে। বসতঘর, গোয়ালঘর, ধানক্ষেত ও হাওরসংলগ্ন এলাকা থেকে এ মাসে ১৯টি সাপসহ মোট ২২টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আতঙ্ক ছড়ালেও স্থানীয়দের সচেতনতার কারণে প্রাণীগুলোকে পিটিয়ে না মেরে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন ও স্থানীয় সূত্রের তথ্যমতে, উদ্ধার হওয়া ২২টি প্রাণীর মধ্যে ১৯টিই বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। এর বাইরে একটি লজ্জাবতী বানর, একটি তক্ষক ও বিরল প্রজাতির একটি উল্টোলেজি বানর (পিগ-টেইলড ম্যাকাক) রয়েছে।
ঘটনাবহুল আগস্টজুড়ে উল্লিখিত উদ্ধারের কয়েকটি ঘটনা:
২ আগস্ট: হাইল হাওরের ধানক্ষেতে পাওয়া একটি অজগর জীবিত উদ্ধার করে বন বিভাগে হস্তান্তর করা হয়।
৩ ও ১৩ আগস্ট: উত্তর ভাড়াউড়ার এক বাড়ির আঙিনা থেকে ১০ ফুট এবং ৫ নম্বর পুল এলাকার একটি বসতঘরের সিলিং থেকে ১২ ফুট লম্বা অজগর উদ্ধার করা হয়।
৬ আগস্ট: হাইল হাওরের রউয়া বিলে জালে আটকে গুরুতর আহত একটি অজগর উদ্ধার করা হলেও পরে সেটি মারা যায়।
১৫ আগস্ট: এক দিনেই পৃথক এলাকা থেকে লজ্জাবতী বানর, তক্ষক, দাঁড়াশ সাপ ও একটি অজগর উদ্ধার করা হয়।
২১ আগস্ট: শ্যামলী আবাসিক এলাকা থেকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আহত একটি উল্টোলেজি বানর উদ্ধার করা হয়।
২৫ আগস্ট: পূর্বাশা এলাকার একটি বাড়ি থেকে বিষধর শঙ্খিনী (শাঁখামুটি) সাপ উদ্ধার করা হয়।
২৬ আগস্ট: সিন্দুরখান ইউনিয়নের কুঞ্জবন থেকে উদ্ধার হওয়া একটি বিরল সাপের বাচ্চা ‘সাইবোল্ডস ওয়াটার স্নেক’ হিসেবে নিশ্চিত করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা।
২৮ ও ৩০ আগস্ট: ভাড়াউড়ার গোয়ালঘর থেকে মুরগি খাওয়া অবস্থায় একটি এবং ইছবপুরের খামার থেকে প্রায় ১৫-১৮ ফুট লম্বা বিশালাকার অজগর উদ্ধার করা হয়।
শ্রীমঙ্গলে বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বনাঞ্চল সংকুচিত হওয়া এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থলে খাদ্যের তীব্র ঘাটতিই মূল কারণ। এছাড়া বর্ষায় সাপের গর্ত পানিতে ভেসে যাওয়ায় শুষ্ক আশ্রয়ের খোঁজে এগুলো লোকালয়ে উঠে আসছে।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল বলেন, "বনাঞ্চল উজাড় বন্ধ এবং বন্যপ্রাণীদের অবাধ বিচরণের জন্য ‘ওয়াইল্ডলাইফ করিডোর’ বা সংযোগ পথ রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি বসতবাড়ির চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলে সাপ বা অন্যান্য প্রাণী সহজে ঢুকে পড়তে পারে না।"
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান জানান, "বর্ষাকালে নিচু এলাকা ও গর্ত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণী শুষ্ক আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ে আসছে। অজগর আকারে বড় হলেও তা নির্বিষ এবং অহেতুক মানুষকে আক্রমণ করে না। উল্টো সাপ পরিবেশের ভারসাম্য ও ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।"
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মুখোমুখি অবস্থান এড়াতে বনের ভেতরের পরিবেশ রক্ষা, অবয়ারণ্য জোরদার এবং স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
ডিডি/ নীরব
মন্তব্য করুন: