মৌলভীবাজারের ব্যতিক্রমী রাঘাটি শিরনি : নিমন্ত্রণ ছাড়াই পথচারীদের আপ্যায়ন
Led Bottom Ad

মৌলভীবাজারের ব্যতিক্রমী রাঘাটি শিরনি : নিমন্ত্রণ ছাড়াই পথচারীদের আপ্যায়ন

নিজস্ব প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার

০৬/০১/২০২৬ ১২:৫৫:২২

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সারিবদ্ধ মাটির চুলা, পাশে বিশাল বিশাল অ্যালুমিনিয়ামের পাতিল। একদিকে রান্না হচ্ছে সাদা ভাত, অন্যদিকে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে লাউ-মুরগির তরকারির সুগন্ধ। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় রান্নার তোড়জোড়। কারণ, দুপুরে আসবেন হাজারো চেনা-অচেনা অতিথি। নেই কোনো নিমন্ত্রণপত্র, তবুও সবাই অতিথি। খোলা আকাশের নিচেই হবে খাওয়াদাওয়া, যা চলবে সন্ধ্যা পর্যন্ত।

রবিবার (৪ জানুয়ারি) মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের ভুজবল গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় এ ব্যতিক্রমী আয়োজন। স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ঐতিহ্যবাহী ‘রাঘাটি শিরনি’ নামে। মূলত পথচারীদের জন্য উন্মুক্তভাবে খাবার পরিবেশনের কারণেই এ নামের প্রচলন। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এ গ্রামীণ প্রথা মানুষে মানুষে ভালোবাসার বন্ধন আরও দৃঢ় করে তুলেছে।

দুপুরের আগেই খোলা মাঠে বসে পড়েন ভোজনরসিকরা। হাজারো পথচারী, চেনা-অচেনা মানুষ খাবারের পাত্র হাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যান। কেউ হেঁটে, কেউ সাইকেলে, আবার কেউ গাড়ি থামিয়ে অংশ নেন এই আয়োজনে। এখানে কেউ আমন্ত্রিত নন—আগত সবাই অতিথি।

অ্যালুমিনিয়ামের পাতিলে গরম ভাত আর লাউ-মুরগির ঝোল পরিবেশন করছেন আয়োজকেরা। হাসিমুখে বলছেন, “ভাই, আইসা খাইয়া যান।” কারও জন্য বাধা নেই, বরং সবার পাতে পছন্দমতো খাবার তুলে দেওয়া হচ্ছে।

অটোরিকশাচালক মইনুদ্দিন বলেন, “খুব সুন্দর পরিবেশে খাওয়াদাওয়া করছি। খেয়ে তৃপ্তি পাইছি। নানা ধরনের মানুষ আসছে—সব মিলিয়ে খুব ভালো লাগছে।”

কুলাউড়া থেকে আসা আবুল হায়দার তরিক বলেন, “ফেসবুকে বহুবার দেখেছি রাঘাটি শিরনির কথা। কিন্তু আসা হয়নি। এবারই প্রথম এসে খেতে পারলাম।”

স্থানীয় ও আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, ভুজবল কপালিবাড়ির উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে রাঘাটি শিরনির আয়োজন হয়ে আসছে। অগ্রহায়ণ মাসে ধান কাটার পর নির্দিষ্ট এক দিনে এই আয়োজন করা হয়। খাবারের মেনুতে থাকে লাউয়ের সঙ্গে মুরগির তরকারি ও সাদা ভাত। তিন রাস্তার মোড়ে উন্মুক্ত স্থানে এই আয়োজন ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। যদিও এটি একটি পরিবারের উদ্যোগ, তবুও প্রতিবেশীসহ অনেকেই স্বেচ্ছায় ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করেন।

উদ্যোক্তা পরিবারের সদস্য জুনেদ আবেদীন বলেন, “আমার পূর্বপুরুষরাই এই প্রথা চালু করেছিলেন। মাঝে কয়েক বছর বন্ধ ছিল। পরে ২০১৩ সাল থেকে আবার নিয়মিত আয়োজন করছি। এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই খেতে পারেন। ধনী-গরিব সব শ্রেণির মানুষ একসঙ্গে খাবার খান—এতেই আমাদের আনন্দ।”

রাঘাটি শিরনি যেন এক অকৃত্রিম ভালোবাসার উৎসব—যেখানে নেই কোনো ভেদাভেদ। খাওয়া শেষে অতিথিদের তৃপ্তির ঢেঁকুর আর আয়োজকদের মুখের প্রশান্ত হাসিতে ভুজবল গ্রামে বছরের শুরুটা হয়ে ওঠে অন্যরকম উষ্ণতায় ভরা।

এ রহমান

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad