ধীরগতির উন্নয়ন, বাড়ছে ঝুঁকি
থমকে গেছে ঢাকা–সিলেট মহাসড়কে প্রকল্পের কাজ,ভোগান্তিতে মানুষ
ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা। দক্ষিণ এশিয়ার উপ–আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প শুরু হয়েছিল বড় প্রত্যাশা নিয়ে। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। বরং কাজের ধীরগতি, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগে মহাসড়কজুড়ে বেড়েছে জনভোগান্তি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটি একাধিক প্যাকেজে ভাগ করে করা হচ্ছে। কিন্তু নরসিংদী, ভৈরব ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল অংশ ঘুরে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় মাসের পর মাস ধরে রাস্তার একপাশ খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। সার্ভিস লেনের কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় বর্ষায় কাদা আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলায় চলাচল দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
কিছু প্যাকেজে গত এক বছরে কাজের অগ্রগতি মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বলে জানা গেছে। খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সড়ক সংকুচিত হয়ে পড়ায় প্রতিদিনই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে যাত্রী, পণ্যবাহী যান ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিকদের অভিযোগ, সড়কের বেজ নির্মাণে নির্ধারিত মান বজায় রাখা হচ্ছে না। কোথাও নিম্নমানের ইটের খোয়া ও স্থানীয় বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক এলাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী কিংবা সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ)-এর কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি নেই। ফলে ঠিকাদাররা নকশা ও প্রাক্কলন উপেক্ষা করেই কাজ চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রকল্পের ধীরগতির বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জমি অধিগ্রহণ জটিলতা। অনেক প্রকৃত জমির মালিক এখনো ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, দালালচক্র ভুয়া স্থাপনা দেখিয়ে ক্ষতিপূরণের অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করছে—এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে।
ঢাকা–সিলেট মহাসড়ককে মূল চার লেনের পাশাপাশি দুই পাশে দুই লেনের সার্ভিস রোডসহ মোট ছয় লেনে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
সওজ, ভূমি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কারণে অনেক এলাকায় কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান অগ্রগতি অনুযায়ী কাজ শেষ হতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এদিকে খানা–খন্দে ভরা সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে। কোথাও কোথাও যানবাহনের গতি কমে যাওয়ার সুযোগে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দ্রুতগতি ও বেপরোয়া ওভারটেকিংয়ের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। চলতি সপ্তাহে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে একটি যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে অন্তত ২০ জন আহত হন।
কাঁচপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত প্রায় ২০৯ কিলোমিটার সড়কে ৬৬টি সেতু ও ৩০৫টি কালভার্ট নির্মাণসহ প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। এতে ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কাও করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের উন্নয়নকাজ দীর্ঘদিন ধরে ধীরগতিতে চললেও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তেমন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। ফলে জনদুর্ভোগ কমার বদলে দিন দিন বাড়ছেই।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: