মাধবপুরে মাটি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ কৃষক
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় ফসলি ও উর্বর কৃষিজমি কেটে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে। স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকাশ্য দিবালোকে ভেকু ব্যবহার করে মাটি কেটে ইটভাটায় সরবরাহ করা হলেও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে না প্রশাসন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন জমির মালিকসহ সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার ছাতিয়াইন সড়কসংলগ্ন পলাশ ব্রিক ফিল্ড এলাকায় কামরুল মিয়া ও মোশারফের নেতৃত্বে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে মাটি উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত। ওই এলাকার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি থেকে দিন-রাত মাটি কেটে তা বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, এই চক্রের বিরুদ্ধে কথা বললে ভয়ভীতি দেখানো হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবাদ করলে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। জমি দখল ও মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে চক্রটির বিরুদ্ধে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ফসলি জমি থেকে এভাবে মাটি উত্তোলন পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ভূমি আইন ও বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
ভুক্তভোগী কৃষক ও সচেতন নাগরিকেরা গত ১৩ জানুয়ারি পুলিশ ও প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের পর মাধবপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নাজমুল হাসান ছাতিয়াইন পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যদের নিয়ে ওই এলাকা পরিদর্শন করেন এবং অভিযোগের সত্যতা পান। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পালিয়ে যাওয়ায় তখন কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
পরদিন উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালালে সাময়িকভাবে মাটি উত্তোলন বন্ধ থাকে। পরে ১৭ জানুয়ারি ছাতিয়াইন পুলিশ ফাঁড়ির সহায়তায় থানা পুলিশ অভিযুক্ত কামরুল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তারের পর তাঁকে ছাড়িয়ে নিতে বিভিন্ন মহল থেকে তদবির করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কামরুল মিয়া জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও মাটি উত্তোলন শুরু করেছেন। সরেজমিনে ছাতিয়াইন ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, পুকুর খননের নামে অতিরিক্ত গভীরভাবে জমি খনন করে কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন করা হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এসব জমিতে ভবিষ্যতে কৃষিকাজ বা মাছ চাষ—কোনোটাই সম্ভব হবে না।
নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা বলেন, “এদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কেউ করে না। পুলিশ ব্যবস্থা নিতে গেলে তারাও চাপের মুখে পড়ে। আমরা সাধারণ মানুষ কী করব?”
এ বিষয়ে মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাহিদ বিন কাশেম বলেন, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও গত ২৫ ডিসেম্বর নোয়াপাড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা আব্দুল মোতাকাব্বির বাদী হয়ে কামরুল মিয়ার বিরুদ্ধে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ১৫(১) ধারায় মামলা করেন। ওই মামলায় একটি ভেকু ও একটি ড্রাম ট্রাক জব্দ করা হয়। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে মাধবপুর থানায় দাঙ্গা ও হত্যাচেষ্টা এবং ঢাকার বিমানবন্দর থানায় একটি হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, অবৈধ মাটি উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় এনে দ্রুত স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা না হলে কৃষি ও পরিবেশের ওপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: