বিপন্ন প্রকৃতি, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য
ছাতকে বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে অবৈধ চুনের ‘পাজু’
সিলেটের ছাতকে চুনাপাথর পুড়িয়ে চুন তৈরির ঐতিহ্য এখন স্থানীয়দের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির পরিবর্তে সনাতন পদ্ধতির মাটির চুলা বা ‘পাজু’তে নির্বিচারে কাঠ পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে চুন। এতে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া আর চুনের গুঁড়ো বাতাসে মিশে দূষিত করছে পরিবেশ, যার মারাত্মক প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্য ও কৃষি জমিতে। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব অবৈধ চুল্লির বিরুদ্ধে প্রশাসন দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ছাতক পৌরসভা ও আশপাশের এলাকায় অর্ধশতাধিক অবৈধ ‘পাজু’ স্থাপন করা হয়েছে। ভারত থেকে আমদানি করা চুনাপাথর বিশেষ প্রক্রিয়ায় এসব চুলায় পোড়ানো হয়। স্থানীয়রা জানান, একেকটি চুলা একটানা ২০ থেকে ২৫ দিন ধরে জ্বলে। এ সময় চারপাশ ঘন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। গ্যাসের বদলে কাষ্ঠ পোড়ানোর ফলে একদিকে বনাঞ্চল উজাড় হচ্ছে, অন্যদিকে বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, “চুনাপাথর ভাঙা ও চূর্ণ করার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ‘ইনডোর প্ল্যান্টে’ হওয়া উচিত। কিন্তু এখানে খোলা স্থানে তা করায় শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালি পরিবেশে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। ডাউকি সীমান্ত থেকে পরিবহন ও উন্মুক্ত প্রক্রিয়াকরণের ফলে গাছের পাতায় ময়লার স্তর পড়ে যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য ও বাস্তুসংস্থানের জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি।”
পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এক সময় ধানের খড় বা ‘ছন’ দিয়ে এই পাজু জ্বালানো হতো। পরবর্তীতে গ্যাসের ব্যবহার শুরু হলেও খরচ কমাতে ব্যবসায়ীরা এখন বনের কাঠ ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন। ছাতক লাইমস্টোন ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড সাপ্লায়ার্স গ্রুপের সভাপতি সেলিম চৌধুরী স্বীকার করেন, গত দুই বছরে গাছের লাকড়ি ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। বর্তমানে সুরমা নদীর দুই তীরে প্রায় অর্ধশতাধিক এমন অবৈধ পাজু রয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, কাঠ পুড়িয়ে চুন তৈরির কোনো অনুমতি নেই। ২৫ জন মালিককে ইতোমধ্যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ডিপ্লোমেসি চাকমা জানান, অবৈধ পাজুগুলোর তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধূলিকণার কারণে স্থানীয়দের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও চর্মরোগের প্রকোপ বাড়ছে। দ্রুত এসব অবৈধ চুল্লি বন্ধ করে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব চুন উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে ছাতকের এই প্রাচীন শিল্পটি জনপদের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
ছাতকে চুন তৈরির ইতিহাস কয়েক শতাব্দীর পুরনো। ১৭৭৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে জর্জ ইংলিশ এই ব্যবসার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। ১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ছাতক সিমেন্ট কারখানা (তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল সিমেন্ট)। এক সময় বিশ্বজুড়ে খ্যাতি থাকলেও বর্তমানে তদারকির অভাব ও পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: