শিক্ষাঙ্গণে নৈতিকতার আলো নিভে যাওয়া এক পরিবর্তিত সময়
১৯৯৩ সালের এক নিঃশব্দ শীতের সকাল। হোসেনাবাদ চা বাগানের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। ছোট্ট আমি হেঁটে যাচ্ছি হোসেনাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিকে—হাতে স্লেট, চোখে ভয় আর মনে এক অদ্ভুত শৃঙ্খলা। সেই শৈশব আজ অনেক দূরে, কিন্তু স্মৃতির ভেতর আজও একদল মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন—আমার শিক্ষকরা।
তাঁরা ছিলেন শুধু শিক্ষক নন, ছিলেন একেকজন নৈতিকতার প্রতীক। লাইলি ম্যাডাম আর হুজুর স্যারদের মতো মানুষদের কাছে শিক্ষা মানে ছিল দায়িত্ব, আর দায়িত্ব মানে ছিল ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়া। তাঁরা বিশ্বাস করতেন—একটি শিশুর ভুল শুধরানো মানে শুধু অঙ্ক শেখানো নয়, বরং তার জীবনের দিক ঠিক করে দেওয়া।
হুজুর স্যারের সেই গম্ভীর কণ্ঠ আজও কানে বাজে—
“পড়া না পারলে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখব!”
সেই সময় আমরা ভয় পেতাম, কিন্তু সেই ভয় ছিল গঠনমূলক। কারণ সেই শাসনের পেছনে ছিল আন্তরিকতা, ছিল দায়বদ্ধতা। একজন শিক্ষক কখনো ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতেন না, সময়ের আগে স্কুলে এসে দাঁড়িয়ে থাকতেন। ছাত্রদের পড়া না পারলে শুধু বকতেন না, বরং আবার বোঝাতেন—বারবার, যতক্ষণ না শেখা সম্পূর্ণ হয়।
লাইলি ম্যাডামদের চোখে ছিল এক ধরনের কঠোর ভালোবাসা। ভুল করলে শাসন করতেন, কিন্তু সেই শাসনের পরই হাত ধরে আবার শেখাতেন। তাঁদের কাছে শিক্ষকতা ছিল চাকরি নয়—ছিল এক ধরনের ইবাদত, এক ধরনের দায়িত্ববোধ।
তখনকার শিক্ষা ব্যবস্থায় হয়তো আধুনিক প্রযুক্তি ছিল না, কিন্তু ছিল নৈতিকতা। শিক্ষক নিজের দায়িত্বকে নিজের জীবনের অংশ হিসেবে দেখতেন। স্কুলে দেরি করা ছিল অচিন্তনীয়, পাঠ না পড়িয়ে ক্লাস শেষ করা ছিল প্রায় অসম্ভব।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দৃশ্য বদলাতে শুরু করেছে। আজকের বাস্তবতায় অনেক জায়গায় অভিযোগ শোনা যায়—শিক্ষকের ক্লাসে অনিয়ম, সময়জ্ঞানহীনতা, পাঠদানে অনাগ্রহ এবং ব্যক্তিগত কাজে বেশি মনোযোগ। কোথাও কোথাও ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের বদলে মোবাইল ফোনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগও উঠে আসে।
অনেক অভিভাবক বলেন, আগে যেখানে শিক্ষক ছিলেন সন্তানের দ্বিতীয় অভিভাবক, এখন সেখানে সেই সম্পর্ক অনেকটাই দূরে সরে গেছে। শিক্ষার্থীরা বইয়ের সঙ্গে যতটা না যুক্ত, তার চেয়ে বেশি যুক্ত হয়ে পড়ছে নানা বিভ্রান্তিতে। আর সেই ফাঁকে কোথাও যেন হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য—মানুষ গড়ে তোলা।
চা বাগানের শিশুদের বাস্তবতা আরও কঠিন। তাদের কাছে শিক্ষা শুধু বই নয়, একটি জীবন বদলের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন যখন দায়িত্বহীনতার দেয়ালে ধাক্কা খায়, তখন পুরো একটি প্রজন্ম পিছিয়ে পড়ে। একজন শ্রমজীবী বাবা যখন সারাদিন পরিশ্রম করে সন্তানের খরচ জোগাড় করেন, তখন তার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে একটি দায়িত্বশীল শিক্ষা ব্যবস্থা।
আজ প্রশ্ন উঠছে—শিক্ষকতা কি আগের মতোই সেই পবিত্র দায়িত্বে আছে? নাকি এটি কেবল একটি পেশায় পরিণত হয়েছে, যেখানে দায়বোধের জায়গা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে?
হোসেনাবাদের সেই লাইলি ম্যাডাম আর হুজুর স্যারদের কথা মনে হলে আজও মনে হয়—তাঁরা শুধু পড়াতেন না, তাঁরা আমাদের গড়ে দিতেন। তাঁদের চোখে ছাত্র ছিল ভবিষ্যৎ, আর সেই ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ।
আজ সময়ের দাবি একটাই—শিক্ষা ব্যবস্থায় আবার সেই নৈতিকতার আলো ফিরিয়ে আনা। যেখানে শিক্ষক হবেন দায়িত্ববান, সময়নিষ্ঠ, এবং সবচেয়ে বড় কথা—শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তরিকভাবে চিন্তিত একজন মানুষ। কারণ শিক্ষা শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান নয়, শিক্ষা হলো একটি জাতির চরিত্র নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: