সিলেটে হামে বাড়ছে শিশুমৃত্যু,দায় কার?
সিলেট এখন এক অস্বস্তিকর নীরবতায় ডুবে থাকা জনস্বাস্থ্য সংকটের নাম—হাম। যে রোগকে অনেক আগেই টিকা ও সচেতনতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছিল, সেই রোগই আবার ফিরে এসে একের পর এক শিশুর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এর মধ্য দিয়ে চলতি বছরে শুধু এই বিভাগেই হাম উপসর্গে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ জনে, যাদের অধিকাংশই শিশু—যাদের জীবনের শুরুটুকু শেষ হওয়ার আগেই থেমে গেছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত শিশুদের বেশি আক্রান্ত করে। প্রথমে শুরু হয় জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও চোখ লাল হওয়া দিয়ে। এরপর শরীরে র্যাশ ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে এটি জটিল আকার ধারণ করে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রোগের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো সময়মতো টিকা গ্রহণ এবং গণটিকাদান কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা। অথচ সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতাই এখন সিলেটকে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৪ জন নতুন সন্দেহভাজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে বিভাগজুড়ে ২৮৯ জন রোগী চিকিৎসাধীন। হাসপাতালগুলোতে শয্যার সংকট এতটাই তীব্র যে এক বেডে একাধিক শিশু রাখা হচ্ছে, কোথাও আবার মেঝেতে চলছে চিকিৎসা। যে হাসপাতালগুলো রোগ প্রতিরোধ ও সেবার কেন্দ্র হওয়ার কথা, সেগুলোই এখন সংক্রমণ ঝুঁকির ভিড়কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
এই ভয়াবহ চিত্র কেবল একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়—এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার নগ্ন প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন উঠছে, এত মৃত্যু, এত ভর্তি, এত সংকটের পরও কেন কার্যকর জরুরি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়নি? কেন মাঠপর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার হয়নি? কেন জনসচেতনতামূলক প্রচার চোখে পড়ছে না?
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো প্রশাসনিক স্তরের নীরবতা। সিলেট থেকে নির্বাচিত হয়ে আমরা মন্ত্রী পেয়েছি দুইজন। তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। দুইমন্ত্রীই নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে সিলেটে আসেন। নানা কর্মসূচী নিয়ে ব্যস্থ থাকনে। এরমধ্যে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বর্তমানে রাষ্ট্রীয় কাজে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তবে সিলেট-১ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের কার্যকর কোনো উদ্যোগ বা হাসপাতাল পরিদর্শনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ গণমাধ্যমে দেখা যায়নি। শিশুমৃত্যুর এই ক্রমবর্ধমান মিছিলের সামনে এই নীরবতা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়াচ্ছে।
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। শয্যার অভাব, আইসোলেশন ইউনিটের ঘাটতি, পর্যাপ্ত জনবল সংকট এবং রোগী ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা—সব মিলিয়ে হাসপাতালগুলো এখন চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এখনই জরুরি করণীয় কী?
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একাধিক স্তরে জরুরি ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। প্রথমত, সিলেট বিভাগজুড়ে জরুরি ভিত্তিতে গণটিকাদান ক্যাম্পেইন চালু করতে হবে। যেসব শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে টিকার আওতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকার পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় জরুরি ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও আইসোলেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সন্দেহভাজন রোগীদের আলাদা ওয়ার্ডে রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণ আর না ছড়ায়। প্রয়োজনে অস্থায়ী ওয়ার্ড বা ফিল্ড হাসপাতাল চালু করার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
তৃতীয়ত, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয়তা বাড়াতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকাদান অবস্থা যাচাই করা এবং দ্রুত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয় এখন সময়ের দাবি।
চতুর্থত, ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচারণা শুরু করতে হবে। রেডিও, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় পর্যায়ের মাইকিংয়ের মাধ্যমে অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে—হাম কতটা ভয়াবহ এবং টিকা কতটা জরুরি।
পঞ্চমত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দায়িত্বশীল পর্যায়ের দৃশ্যমান সক্রিয়তা। সংকটের মুহূর্তে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাঠে থাকা, হাসপাতাল পরিদর্শন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
একজন শিশু যখন হামে আক্রান্ত হয়ে শ্বাস নিতে কষ্ট পায়, তখন সেটি শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়—এটি একটি সমাজের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি মৃত্যুই প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে—আমরা কি যথেষ্ট প্রস্তুত ছিলাম? আমরা কি যথেষ্ট দায়িত্বশীল ছিলাম?
আজ সিলেটের এই সংকট শুধু চিকিৎসার ঘাটতি নয়, এটি সমন্বয়হীনতা, উদাসীনতা এবং দেরিতে নেওয়া সিদ্ধান্তের ফলাফল। এখনই যদি দ্রুত, কঠোর এবং সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
শিশুদের কান্না আর মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে এখনই প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মানবিক দায়িত্ববোধ।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: