সিলেটে শিশু হাফেজের ওপর মধ্যযুগীয় বর্বরতা
ক্ষতস্থানে দেওয়া হতো লবণ-মরিচ!
সিলেটে মাত্র ১১ বছরের এক শিশু হাফেজের ওপর দীর্ঘ ৯ মাস ধরে চলা মধ্যযুগীয় ও পাশবিক নির্যাতনের এক শিউরে ওঠার মতো লোমহর্ষক চিত্র সামনে এসেছে। জিম্মি করে ওই শিশুর ওপর চালানো হয়েছে অমানবিক শারীরিক ও যৌন নিপীড়ন। এই ঘটনায় জড়িত মূল হোতা মো. ফয়সাল আহমদ কামরানকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে শাহপরাণ থানা-পুলিশ।
পুলিশ ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নির্যাতনের শিকার ওই শিশু শিক্ষার্থী (১৬ পারার হাফেজ) জকিগঞ্জ উপজেলার নূরনগর গ্রামের এক দুবাই প্রবাসীর ছেলে। অন্যদিকে, গ্রেপ্তার হওয়া পাষণ্ড ফয়সাল আহমদ কামরানের বাড়ি জকিগঞ্জের খাদিমানে।
অভিযোগের বিবরণ যেন সুস্থ মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। গত ৯ মাস ধরে শিশুটিকে একটি বাসায় অবরুদ্ধ করে রেখে প্রতিনিয়ত চালানো হতো পৈশাচিক নির্যাতন। শিশুটির শরীরের এমন কোনো অংশ বাকি নেই যেখানে আঘাতের কালশিটে বা ক্ষতচিহ্ন পড়েনি। এমনকি তার গোপনাঙ্গেও চালানো হয়েছে জঘন্যতম নিপীড়ন। নির্যাতনের তীব্রতা ও যন্ত্রণা বাড়াতে ক্ষতস্থানে জোর করে মেখে দেওয়া হতো লবণ ও মরিচের গুঁড়ো! দীর্ঘদিনের এই নির্মম ও পৈশাচিক অত্যাচারে শিশুটির শরীরের বিভিন্ন অংশে পচন ধরেছে এবং ক্ষত থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, যে বাসায় শিশুটিকে আটকে রেখে এই পাশবিকতা চালানো হতো, সেখানে আরও পাঁচজন নারী ও কিশোরী বসবাস করতেন। তারা কেউ অভিযুক্ত ফয়সালের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় নন। ভুক্তভোগী শিশুর ভাষ্যমতে, ওই কিশোরীদের ওপরও বিভিন্ন সময় জঘন্য যৌন নিপীড়ন চালানো হতো। সবাইকে এক প্রকার ব্ল্যাকমেইল ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল ওই ‘টর্চার সেলে’।
বাসায় অবস্থানরত নারীদের কয়েকজন ভুক্তভোগী শিশুর দূরসম্পর্কের স্বজন হলেও, ফয়সালের হিংস্রতার ভয়ে তারা কখনো এই নির্মম নির্যাতনের প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। কিছুদিন আগে এক কিশোরীর বাবা তাকে ওই বাসা থেকে ফিরিয়ে নিতে এলেও ফয়সালের ব্ল্যাকমেইলের জালে আটকে থাকা মেয়েটি নিজের বাবার সাথে ফিরে যেতে পারেনি। এই ঘটনার নেপথ্যে গভীর ও ভয়ঙ্কর কোনো অপরাধ চক্র লুকিয়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রোমহর্ষক এই ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর শাহপরাণ থানা-পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে মূল হোতা মো. ফয়সাল আহমদ কামরানকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানায়, কামরানের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন এলাকায় একাধিক গুরুতর ও ভয়ঙ্কর অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
শাহপরাণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ‘প্রথম সিলেট’ কে বলেন, "অভিযোগ পাওয়ার পরপরই আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়ে আসামিকে গ্রেপ্তার করেছি। ভুক্তভোগী শিশুটিকে উদ্ধার করে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই ভয়ঙ্কর চক্রের সাথে আর কেউ জড়িত আছে কি না এবং নারীদের এভাবে জিম্মি রাখার পেছনে আসল রহস্য কী, তা খতিয়ে দেখতে আমাদের জোর অনুসন্ধান ও জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।"
এদিকে অবুঝ এক শিশু হাফেজের ওপর এমন মধ্যযুগীয় বর্বরতার খবর ছড়িয়ে পড়ায় পুরো সিলেটে চরম ক্ষোভ ও তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এই লম্পট ও নৃশংস নির্যাতনকারীর দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক কঠোরতম শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: