শাল্লায় হাওরের ত্রাণে স্বজনপ্রীতি, বাদ পড়েনি প্রবাসী ও মৃত ব্যক্তি
টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার হাওরাঞ্চলে ফসল হারিয়ে যখন হাজারো কৃষক দিশেহারা, তখন তাদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারের মানবিক সহায়তা কর্মসূচির তালিকা প্রণয়নে নজিরবিহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে তালিকায় স্থান পেয়েছেন ইউপি সদস্যদের পরিবারের ৭-৮ জন সদস্য, সরকারি শিক্ষক, এনজিওকর্মী এবং ঢাকা প্রবাসী গার্মেন্টস শ্রমিকরা। এমনকি তালিকা থেকে বাদ পড়েনি মৃত ব্যক্তিদের নামও।
স্থানীয় ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, মাঠ পর্যায়ে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ না করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের পছন্দের মানুষ ও আত্মীয়-স্বজনদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা এবং মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ‘গ’ শ্রেণীর অকৃষকদের ‘ক’ শ্রেণীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার ৩ নং বাহারা ইউনিয়ন পরিষদের ২ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য দেবব্রত সরকারের (মাতব্বর) বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। তিনি নিজের পরিবারেরই ৭ জন সদস্যের নাম ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যার মধ্যে একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকও রয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রামে দলাদলি থাকার কারণে ইউপি সদস্য দেবব্রত তার বিরোধী পক্ষের কাউকেই তালিকায় রাখেননি। ফলে পোড়ারপাড় গ্রামের প্রায় ৩০টি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবার সরকারি এই সহায়তা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েছেন। এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইউপি সদস্য দেবব্রত দাসের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
একই ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মিহির চৌধুরীর বিরুদ্ধেও একই ধরণের লুটেরা সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। তালিকার ২৮৬ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে স্বয়ং মিহির চৌধুরীর নাম। অথচ হাওরে তার মাত্র ৫ কেয়ার জমি ছিল এবং বৃষ্টির আগেই তিনি সমস্ত ফসল কেটে ঘরে তুলেছেন। তার ফসলের কোনো ক্ষতি না হলেও তিনি নিজেকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ দেখিয়েছেন। এছাড়া তালিকার ২৮৮ নম্বরে রয়েছে তার বাবা মনমোহন চৌধুরীর নাম, যিনি গত ৫ মাস ধরে ঢাকায় মেয়ের বাসায় অবস্থান করছেন। ৩২৫ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে মিহির চৌধুরীর আপন কাকা অখিল চন্দ্র চৌধুরীর নাম এবং ১১৬ ও ১০৭ নম্বরে রয়েছে ঢাকা প্রবাসী দুই ভাই জিপেশ সূত্রধর ও তার ভাইয়ের নাম—যারা কেউই হাওরে কোনো চাষাবাদ করেননি।
গ্রাম্য ভাষায় স্থানীয় কৃষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, বাপে-পুতে আর আত্মীয়রা মিলে সব সরকারি মাল একাই ঘিলে খাচ্ছে। এই বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সদস্য মিহির চৌধুরী দায় এড়ানোর চেষ্টা করে বলেন, আমার তালিকা অন্যরা করেছেন। তালিকায় কিছু মৃত ব্যক্তির নাম আসতে পারে, এগুলো বাদ দেওয়ার বিষয়ে পরিষদে আলোচনা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পোড়ারপাড় গ্রামের এক হতাশ কৃষক জানান, আমি হাওরে ২০ কেয়ার জমিতে চাষ করেছিলাম। বন্যায় মাত্র ৮ কেয়ার জমি কাটতে পেরেছি, বাকি সব পানিতে তলিয়ে গেছে। এত বড় ক্ষতি হওয়ার পরও আমার নাম তালিকায় উঠেনি। অথচ মেম্বারের বাপ, কাকা আর ঢাকা থাকা মানুষরা জমি না করেও তালিকার প্রথম সারিতে আছে। আমরা কার কাছে বিচার চাইব?
এ বিষয়ে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO) পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, তালিকায় কোনো মৃত ব্যক্তি, প্রবাসী বা অযোগ্য ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। তদন্ত সাপেক্ষে অকৃষক ও ভুয়া সুবিধাভোগীদের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান জানান, জেলার ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের একটি তালিকা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। তদন্তে কোনো অকৃষক বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের নাম অবিলম্বে তালিকা থেকে কেটে দেওয়া হবে।
দুর্যোগকবলিত হাওরাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকেরা যখন বেঁচে থাকার লড়াই করছেন, তখন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এমন জঘন্য দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি সরকারের জনবান্ধব কর্মসূচিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে এই ভুয়া তালিকা বাতিল করতে হবে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।
প্রীতম দাস/ ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: