ইউএনও অফিসে অভিযোগ
জকিগঞ্জের সেই ‘কবিরাজ’ কারাগারে থাকলেও থামেনি অনৈতিক কার্যক্রম
সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় কবিরাজ ও মাওলানা পরিচয়ধারী এক প্রতারকের মূল হোতা বর্তমানে কারাগারে থাকলেও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে অনৈতিক, অলৌকিক ও সন্দেহজনক কার্যক্রম সমানে চালিয়ে যাওয়ার তীব্র অভিযোগ উঠেছে। জকিগঞ্জের খাদিমান এলাকায় এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করায় প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে একটি লিখিত যৌথ আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। আবেদনপত্র ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার খাদিমান এলাকার ফয়সল আহমদ কামরান নামের এক ব্যক্তি নিজেকে বড় কবিরাজ ও মাওলানা পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে ঝাড়ফুঁক, জিন তাড়ানো ও তাবিজ-কবজ সংক্রান্ত প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, কামরান একটি নিরীহ পরিবারের সঙ্গে জোরপূর্বক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের বসতবাড়িতে স্থায়ীভাবে আস্তানা গাড়েন এবং ওই বাড়ির একটি নির্দিষ্ট গোপন কক্ষে পানি, মাটি, তেজপাতা, বেলপাতাসহ বিভিন্ন অলৌকিক উপকরণ ব্যবহার করে কথিত চিকিৎসা ও ঝাড়ফুঁকের নামে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতেন; যা নিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বিরোধ ও সমালোচনা চলছিল। পরবর্তীতে এলাকাবাসীর তীব্র চাপ ও স্থানীয় প্রশাসনের সরাসরি সহযোগিতায় প্রায় এক বছর আগে তাকে ওই বাড়ি থেকে বিতর্কিতভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
লিখিত আবেদনে আরও জানা যায়, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ভন্ড কবিরাজের একটি অন্ধকার জগতের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ব্যাপকভাবে ভাইরাল হওয়ার পর পুরো বিষয়টি জকিগঞ্জে নতুন করে আলোচনায় আসে। একই সঙ্গে তাহসিন আহমদ মিজান নামের এক স্থানীয় কিশোরকে দীর্ঘদিন ধরে ওই গোপন আস্তানায় আটকে রেখে নির্মমভাবে নির্যাতন করার একটি হাড়হিম করা অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কবিরাজের এই সব ভন্ড ও অনৈতিক কার্যকলাপে বাধা দেওয়ায় ওই কিশোরকে হাত-পা বেঁধে লোহার রড দিয়ে উপর্যুপরি মারধরসহ মধ্যযুগীয় কায়দায় শারীরিক নির্যাতন করা হয়; এমনকি মারধরের পর তার শরীরের ক্ষতস্থানে জখম বাড়িয়ে দিতে ও চিৎকার বন্ধ করতে নিষ্ঠুরভাবে কাঁচা লবণ ও মরিচের গুঁড়ো লাগানোর মতো অমানবিক ও পৈশাচিক আচরণ করা হয়। এই পৈশাচিক নির্যাতনের ঘটনাটি ফাঁস হলে জকিগঞ্জ থানা পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত ভন্ড কবিরাজ ফয়সল আহমদ কামরানকে গ্রেপ্তার করে এবং তিনি বর্তমানে আদালতের নির্দেশে কারাগারে চিকিৎসাধীন ও বন্দি রয়েছেন। তবে জকিগঞ্জের সচেতন এলাকাবাসীর দাবি, মূল হোতা কামরান কারাগারে আটক থাকলেও ওই এলাকার পরিস্থিতি মোটেও স্বাভাবিক হয়নি; বরং তার অবর্তমানে তার পরিবারের অন্য সদস্যরা ও উগ্র অনুসারীরা এলাকায় আগের মতোই অন্ধকারের কার্যক্রম ও কথিত ঝাড়ফুঁকের আস্তানা বহাল তবিয়তে চালিয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, সর্বশেষ গত ১৬ মে রাতে কয়েকজন অজ্ঞাত ও সন্দেহভাজন বহিরাগত পুরুষকে সঙ্গে নিয়ে ওই পরিবারের সদস্যরা এলাকায় প্রবেশ করে ব্যাপক হট্টগোল সৃষ্টি করেন এবং এলাকাবাসীকে নানা ধরণের হুমকি-ধমকি দিয়ে সন্দেহজনক আচরণ করেন, যার ফলে পুরো খাদিমান এলাকায় বর্তমানে গভীর সামাজিক অসন্তোষ ও চরম নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা মনে করছেন, এ ধরনের ভন্ড ও অনৈতিক ধর্মীয় অবমাননাকর কার্যক্রম দ্রুত বন্ধ করা না হলে জকিগঞ্জের সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি চিরতরে বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় ধরণের অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এই বিষয়ে জানতে চাইলে জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের এক দায়িত্বশীল সূত্র লিখিত আবেদন পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এলাকাবাসীর অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে নির্দেশনা দিয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: