চা সিলেটের, রাজত্ব চট্টগ্রামের!
Led Bottom Ad

সিন্ডিকেটের মরণকামড়

চা সিলেটের, রাজত্ব চট্টগ্রামের!

শাহিন আহমেদ,শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি

১৯/০৫/২০২৬ ১৬:১৪:৪৮

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে যেখানে কুয়াশাভেজা সকালে জেগে ওঠে ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’, যেখানে মাইলের পর মাইল চোখ জুড়ানো চায়ের সবুজ গালিচা জানান দেয়—এ মাটির স্পন্দনই চা; সেই রূপময় সিলেট অঞ্চল আজ এক নীরব বেদনায় নীল। প্রবাদ আছে, ‘চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল’। অথচ কী নির্মম বাস্তব! যে মাটির বুক চিরে জন্ম নেয় দেশের সিংহভাগ চা, সেই মাটির সুবাসিত চায়ের সিংহভাগেরই দখল আজ ৩৮৫ কিলোমিটার দূরের চট্টগ্রামের হাতে। এক অদৃশ্য ও শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়ে আছে শ্রীমঙ্গলের আন্তর্জাতিক চা নিলাম কেন্দ্র। ফলে রক্ত জল করা পরিশ্রমে উৎপাদিত চায়ের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সিলেট অঞ্চলের বাগান মালিক আর চা-শ্রমিকেরা।


চায়ের গুণগত মান রক্ষা, দ্রুত বাজারজাতকরণ এবং কোটি কোটি টাকার পরিবহন খরচ বাঁচানোর স্বপ্ন নিয়ে দীর্ঘ ৬৮ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছিল। ২০১৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর শ্রীমঙ্গলে স্থাপন করা হয়েছিল দেশের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক চা নিলাম কেন্দ্র। বুকভরা আশা নিয়ে সিলেট অঞ্চলের মানুষ ভেবেছিল, এবার হয়তো চায়ের রাজধানী তার পূর্ণ মর্যাদা ফিরে পাবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও সুফল মেলেনি। আলোর মুখ দেখার আগেই কেন্দ্রটি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের জালে।


পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই বৈষম্যের চিত্র আরও স্পষ্ট এবং চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত শোনায়। দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ১৭২টি চা বাগানের মধ্যে ১৩৫টিই অবস্থিত চায়ের চারণভূমি সিলেট অঞ্চলে (মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেট)। দেশের মোট উৎপাদিত চায়ের ৯০ ভাগের বেশি আসে এই পুণ্যভূমি থেকে। অথচ, ঘরের মাঠে নিলাম কেন্দ্র থাকার পরও দেশের মোট উৎপাদিত চায়ের প্রায় ৯৮ ভাগ বেচাকেনা হয় সুদূর চট্টগ্রামে!


পুরো মৌসুমে যেখানে চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রে বিক্রি হয় প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি কেজি চা, সেখানে চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল নিলাম কেন্দ্রে বিক্রি হয় মাত্র ২০ থেকে ৩০ লাখ কেজি চা! এই হিসাব যেন শ্রীমঙ্গলের চায়ের ঐতিহ্যের মুখে এক চরম উপহাস।


সিলেটের বুক থেকে চা পাতা পেড়ে তা প্রক্রিয়াজাত করার পর পাঠাতে হচ্ছে চট্টগ্রামের সুদূর বন্দরে। লাক্কাতুরা চা বাগানের ব্যবস্থাপক আনোয়ার হোসেন অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, “সিলেট থেকে চট্টগ্রামের সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ৩৮৫ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চা পাঠাতে গিয়ে একদিকে যেমন আমাদের উৎপাদন খরচ আকাশচুম্বী হচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ট্রাকে রোদে-বৃষ্টিতে থাকায় চায়ের সেই চিরচেনা সুবাস ও গুণগত মানও ধরে রাখা যাচ্ছে না।”


কেন চায়ের রাজধানী চরের মতো পড়ে আছে? এই স্থবিরতার পেছনের অন্ধকার সত্যটি তুলে ধরেছেন নিনা-আফজাল টি কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফজাল রশীদ চৌধুরী। তিনি জানান, শ্রীমঙ্গলে পর্যাপ্ত আধুনিক গুদাম (ওয়ারহাউজ), উন্নত পরিবহন ও ব্যাংকিং সহায়ক ব্যবস্থার বড় সীমাবদ্ধতা তো রয়েছেই, কিন্তু তার চেয়েও বড় সংকট মানুষের তৈরি। বড় ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশকে এখনো চট্টগ্রামমুখী করে রাখা হয়েছে। একটি বিশেষ চক্র বা সিন্ডিকেট অনেক ব্রোকার ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাকে শ্রীমঙ্গলে আসতে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে বাধা দিচ্ছে। তারা চায় না শ্রীমঙ্গল স্বাবলম্বী হোক।


এই অচলাবস্থা কেবল বাগান মালিকদের লোকসান নয়, বরং জড়িয়ে আছে লাখো চা-শ্রমিকের ভাগ্য ও আবেগ। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে এবং স্থানীয় চা শিল্পকে মরণের হাত থেকে বাঁচাতে এখন সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কোনো পথ নেই।


শ্রীমঙ্গল চা নিলাম কেন্দ্রের পরিচালক এস এম এন ইসলাম মুনির একটি সুনির্দিষ্ট ও আশাব্যঞ্জক প্রস্তাব দিয়ে বলেন, “সরকার যদি নিয়ম বা নীতিমালা করে দেয় যে, দেশে উৎপাদিত চায়ের অন্তত ৫০ ভাগ শ্রীমঙ্গল চা নিলাম কেন্দ্রে বিক্রি করতে হবে, তবেই এই নিলাম কেন্দ্রটি প্রাণ ফিরে পাবে, হয়ে উঠবে গতিশীল।”


সবুজ পাতার ঘ্রাণে যে শ্রীমঙ্গলের বাতাস ম ম করার কথা ছিল, তা আজ সিন্ডিকেটের নিগড়ে বন্দি। চায়ের রাজধানী কি শুধুই খাতায়-কলমে নাম হয়ে থাকবে, নাকি রাষ্ট্র চায়ের প্রকৃত হকের অধিকার ফিরিয়ে দেবে শ্রীমঙ্গলকে—এখন এটাই কোটি টাকার প্রশ্ন। দ্রুত সরকারি উদ্যোগ না নিলে অচিরেই এই অঞ্চলের গৌরবময় চা শিল্প এক মহাসংকটের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে।

ডি আর ডি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad