‘হাঁড়ি কাব্য’: এক হাঁড়িতে একান্ন জন
Led Bottom Ad

‘হাঁড়ি কাব্য’: এক হাঁড়িতে একান্ন জন

তাহির আহমদ

১৮/০৫/২০২৬ ২২:৩১:২৩

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

এক হাঁড়িতে একান্ন জন। এই নিয়ে কোনো কবি হয়তো নতুন কবিতা লিখতে পারেন। যার নাম হতে পারে ‘হাঁড়ি কাব্য’। ‘হাঁড়ি কাব্য’ লিখতে হলে যেতে হবে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার বিনন্দপুর গ্রামে। আধুনিকতার জোয়ারে যেখানে ভাই-ভাই আলাদা হয়ে যাচ্ছে, ব্যক্তিস্বার্থ আর অহমিকার টানে ভেঙে চুরমার হচ্ছে এক একটি পরিবার, ঠিক তখনই একতার এক অবিশ্বাস্য নজির সৃষ্টি করেছে জুড়ীর এই গ্রাম। গ্রামের পূর্ব জুড়ী ইউনিয়নে বসবাসরত ৫১ সদস্যের বিশাল ‘রুদ্রপাল পরিবার’ দীর্ঘ প্রায় ৮০ বছর ধরে এক ছাদের নিচে, এক হাঁড়ির অন্ন খেয়ে বেঁচে আছে। ৯ ভাই, ১২ জা এবং তাঁদের সন্তানদের এই মেলবন্ধন যেন বর্তমান স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক সমাজের বুকে এক জীবন্ত রূপকথা!


৫১ জনের এই বিশাল পরিবারের প্রতিদিনের তিন বেলার খাবারের আয়োজন সামলানো কোনো সাধারণ কাজ নয়। তবে এই কঠিন চ্যালেঞ্জকে এক চমৎকার শৃঙ্খলায় রূপ দিয়েছেন বাড়ির ১২ জন গৃহবধূ। সারাদিনের কাজের চাপ সামলাতে তাঁরা চারজন করে তিন দলে ভাগ হয়ে সকাল, দুপুর আর রাতের রান্নার দায়িত্ব পালন করেন। এক দলের রান্নার সময় অন্য দলগুলো ঘরের বাকি কাজ ও সন্তানদের দেখভাল করেন।


পরিবারের এক পুত্রবধূ তাঁর অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে বলেন, “আমার বিয়ে হয়েছিল ১২ বছর আগে। প্রথমে ভেবেছিলাম ছোট পরিবার থেকে এসে এত বড় পরিবারে কীভাবে মানিয়ে নেব? শুরুতে খুব ভয় ও সংকোচ লাগত। কিন্তু এই বাড়িতে এসে সবার যে আদর আর ভালোবাসা পেয়েছি, এখন এই বড় পরিবারই আমার কাছে স্বর্গ।” রান্নাঘরের বাইরেও কাজের সুষম বণ্টন রয়েছে বিনন্দপুরের এই বাড়িতে। এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই তাদের দীর্ঘ আট দশক ধরে এক হাঁড়ির অন্ন ধরে রাখার প্রধান শক্তি।


বিনন্দপুরের এই পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্পদ ও ভবিষ্যৎ হলো তাদের পরবর্তী প্রজন্ম। ১২ জন ভাই-বোন একই সাথে একই বাড়িতে পিঠাপিঠি বেড়ে উঠছে। তাদের কাছে পড়াশোনা কিংবা খেলাধুলা মানেই এক বিশাল উৎসব। প্রতিদিন সকালে সবাই একসাথে নাশতা সেরে দল বেঁধে স্কুলে যায়। বিকেলে বাড়ির বিশাল উঠানেই তাদের জমে ওঠে ক্রিকেট কিংবা ব্যাডমিন্টন খেলার আসর। শৈশবের এই যৌথ আনন্দ ও কোলাহল তাদের মানসিক বিকাশকে আরও সমৃদ্ধ করছে।


পরিবারটির অর্থনৈতিক ভিত্তি যেমন মজবুত, তেমনি এর উৎসও বহুমুখী। নিজেদের ১০০ বিঘা জমির ফসল, মৎস্য খামার আর ফলজ-বনজ বাগান থেকে যেমন পরিবারের প্রায় পুরো খাবারের জোগান আসে, তেমনি সদস্যরা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন। সদস্যদের মধ্যে কেউ নিয়োজিত আছেন শিক্ষকতায়, কেউ বেসরকারি সংস্থা ‘ব্র্যাক’-এ কর্মরত, কেউ চিকিৎসক হিসেবে মানবসেবা করছেন, আবার কেউ বা প্রবাসে থেকে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন।


এই বহুমুখী আয়ের পেছনে রয়েছে এক অভূতপূর্ব আর্থিক শৃঙ্খলা। নিয়ম অনুযায়ী, মাসশেষে সব সদস্যের অর্জিত আয় এককভাবে জমা হয় বড় ভাইয়ের হাতে। সেই কেন্দ্রীয় তহবিল থেকেই মেটানো হয় পড়াশোনা, চিকিৎসা ও সংসার পরিচালনাসহ পরিবারের সব ধরনের প্রয়োজন। এই আর্থিক স্বচ্ছতা ও এক হাত দিয়ে খরচ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিটিই তাদের বিরোধহীন থাকার অন্যতম রহস্য।


এই পরিবারটির ইতিহাস বেশ প্রাচীন ও গৌরবময়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ঠিক আগে ভারত থেকে এসে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার বিনন্দপুর গ্রামে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছিলেন ভীম রুদ্রপাল। আজ তাঁরই উত্তরসূরীরা আশি বছর পরেও সেই পূর্বপুরুষের নীতি ও আদর্শ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলছেন।


পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা জানান, দীর্ঘ আশি বছর ধরে একসঙ্গে টিকে থাকার মূল রহস্য হলো—যেকোনো সমস্যা হলে সবাই মিলেমিশে একসাথে বসে তার সমাধান করা। কোনো ব্যক্তিগত অহংকার বা মতভেদকে তাঁরা পরিবারের ঐক্যের চেয়ে বড় হতে দেন না। ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে সমষ্টিগত কল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়ার এই সনাতন নীতিই আজ বিনন্দপুরের রুদ্রপাল পরিবারকে আধুনিক ডিজিটাল যুগের ফেসবুক-ইউটিউবে এক অনুকরণীয় আদর্শে পরিণত করেছে।

ডি আর ডি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad