কমলগঞ্জে সরকারি স্কুলে শিক্ষার নামে তামাশা
স্কুলের শ্রেণিকক্ষে ‘ভাতের হোটেল’, খাট-বিছানা!
যেখানে শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, বর্ণমালার গুঞ্জনে মুখরিত হওয়ার কথা বিদ্যাপীঠ; সেখানে বসানো হয়েছে ভাতের হোটেল আর শোয়ার ঘর! মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী কালারাই বিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার পবিত্র পরিবেশকে এভাবেই ধূলিসাৎ করার এক নজিরবিহীন ও লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেছে। একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষকে একাধারে ভাতের হোটেল, রান্নাঘর আর থাকার ঘর বানিয়ে চরম জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের উৎসব চলছে এখানে। এই ঘটনায় পুরো উপজেলাজুড়ে এখন তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভের ঝড় বইছে।
এতদিন যে বিদ্যালয়টি পরিচ্ছন্ন ও মনোরম পরিবেশের জন্য এলাকায় প্রশংসিত ছিল, ক্ষমতার লোভ আর চরম উদাসীনতায় আজ তা কলঙ্কিত। স্থানীয় ক্ষুব্ধ বাসিন্দা ও অভিভাবকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির কক্ষটিকে রীতিমতো ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে ফেলা হয়েছে। কোমলমতি শিশুদের বেঞ্চ হটিয়ে সেখানে বসানো হয়েছে রান্নার চুলা ও হাঁড়ি-পাতিল। শুধু তা-ই নয়, দিনদুপুরে সেখানে চলছে রান্নাবান্না ও হোটেল ব্যবসা, আর রাতে ঘুমানোর জন্য পাতা হয়েছে খাট-বিছানা! মাঝেমধ্যেই সেখানে বহিরাগত লোকজনের সন্দেহজনক আড্ডা ও অবস্থান দেখা যায় বলেও অভিযোগ করেছেন অভিভাবকেরা।
সরকারি একটা বিদ্যাপীঠের ভেতরে কীভাবে এমন ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস পায় অসাধু চক্র? ক্ষোভে ফুঁসে ওঠা অভিভাবকেরা বলছেন, যেখানে শিশুদের পড়ালেখার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা, সেখানে প্রকাশ্য দিবালোকে এই নোংরামি চলছে। এটা শুধু দুঃখজনকই নয়, দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার গালে এক বিরাট চপেটাঘাত। এর ফলে বিদ্যালয়ের সুনাম যেমন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, তেমনি শিশুদের ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে পড়েছে।
বিদ্যালয়ের পবিত্রতা নষ্টের এই জঘন্য অপরাধের কথা একপর্যায়ে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুনমুন বনিক। তবে তাঁর দায়সারা বক্তব্য ক্ষোভের আগুন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি নির্বিকারভাবে বলেন, “দুই-একদিনের মধ্যে স্কুল থেকে সব সরঞ্জাম সরিয়ে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে।” প্রশ্ন ওঠে, এতদিন ধরে কার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে একটি সরকারি শ্রেণিকক্ষকে শোয়ার ঘর আর হোটেল বানানো হলো? এর পেছনে জড়িত মূল হোতাদের শাস্তির কথা না বলে, স্রেফ মালামাল সরিয়ে নেওয়ার এমন আশ্বাস খোদ প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা নিয়েই বিরাট প্রশ্ন তোলে।
এদিকে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর টনক নড়েছে প্রশাসনের। বিষয়টি সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন উল্লেখ করে কমলগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এনামুর রহিম বাবর জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। দ্রুত তদন্ত করে এই অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শ্রেণিকক্ষ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা শিক্ষা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ও দুঃখজনক। আমরা এটি কোনোভাবেই মেনে নেব না। দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
হাওরপাড় ও সীমান্তবর্তী এলাকার অসহায় শিশুদের শিক্ষার এই করুণ দশা দেখে সাধারণ মানুষ এখন একটাই দাবি তুলছেন—শুধু লোকদেখানো মালামাল সরানো নয়, বিদ্যাপীঠকে ব্যবসার আখড়া বানানো সেই অপরাধীদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে চাকরিচ্যুতসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
তাহির আহমদ / ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: