সিলেটে ভিসার নামে ‘ভিডিও ফাঁদ’: হাজার টাকায় কেনা হয় সফলতার গল্প!
অফিসের রাজকীয় চাকচিক্য, অভ্যর্থনা ডেস্কে একাধিক সুন্দরী নারী কর্মী, প্রতিদিন বিভিন্ন ফেসবুক পেজে চটকদার লাইভ আর সিলেটের নামী ওলি-গলির মোড়ে মোড়ে চোখধাঁধানো সব বিলবোর্ড। বিশাল ও ব্যয়বহুল অফিসের এই বাহ্যিক বাহারি ডেকোরেশন আর প্রচারণার প্রথম ধাপেই কুপোকাত হচ্ছেন সরলমনা গ্রাহকেরা। এর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমানে ছড়ানো হচ্ছে সপরিবারে ইউরোপ-আমেরিকার ভিসা হাতে হাস্যোজ্জ্বল মানুষের ছবি কিংবা বিদেশযাত্রার সাজানো সব ‘সফলতার গল্প’। কোনো রকম বাছবিচার ছাড়াই এসব দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষ অন্ধের মতো বিশ্বাস করছেন যে, নির্ভরযোগ্য কোনো এজেন্সির মাধ্যমেই বুঝি তাদের ভাগ্য খুলতে চলেছে। তবে এই জমকালো আবরণের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গা শিউরে ওঠার মতো ভয়ংকর প্রতারণার জাল।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভিডিওতে যাদের ‘ভিসাপ্রাপ্ত সুখী পরিবার’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, বাস্তবে তারা কেউ প্রবাসে যাচ্ছেন না, এমনকি তাদের কারও ইউরোপ-আমেরিকার কোনো ভিসাও হয়নি। সামান্য কয়েকটা টাকা আর এক প্যাকেট বিরিয়ানির বিনিময়ে দিনমজুর, অভাবী ও প্রান্তিক মানুষকে ভাড়া করে এনে ক্যামেরা ট্রায়াল করিয়ে সাজানো হচ্ছে এসব ‘ভিসা পাওয়ার লাইভ ও ভিডিও রিভিউ’। এই জঘন্য ও সুসংগঠিত জালিয়াতির ফাঁদে পড়ে সিলেটের হাজারো মানুষ ভিটেমাটি ও জীবনের শেষ সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। কেউ কেউ চড়া দামে প্রতারিত হয়ে বিমানবন্দর থেকেই ফেরত আসছেন, আবার কেউ কেউ দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারীদের হাতে জিম্মি হচ্ছেন। এই জালিয়াতির জাল পুরো সিলেট বিভাগজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যার মূল উপকেন্দ্রে রয়েছে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ; আর মূল সিন্ডিকেটটি নির্বিঘ্নে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে খোদ সিলেট বিভাগীয় শহর থেকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘অ্যামেক্স অ্যাসোসিয়েটস’ নামের একটি কথিত ভিসা এজেন্সির ফেসবুক পেজে প্রচারিত এমনই কিছু ভিডিওর সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নামে এই প্রতিবেদক। পেজটিতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইমন উদ্দিন প্রতিনিয়ত একের পর এক পরিবারের হাতে কানাডা, পর্তুগালসহ ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশের ভিসা তুলে দেওয়ার ভান করছেন। এর মধ্যে দুটি নির্দিষ্ট ভিডিওর উৎস খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, ভিডিওতে অভিনয় করা পাঁচজন ব্যক্তির বাড়িই হবিগঞ্জ সদর উপজেলার আব্দাবখাই গ্রামে।
প্রথম ভিডিওতে যে পরিবারটির কানাডার ভিসা পাওয়ার দাবি করা হয়, তার প্রধান কর্তা সানু মিয়া বাস্তবে সিলেটে আনসার ভিডিপিতে চাকরি করেন। তবে ভিডিওতে তাঁর পাশে স্ত্রী ও সন্তান হিসেবে যাদের দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তারা তাঁর পরিবারের কেউ নন। ভিডিওতে সানু মিয়ার ছেলে সাজা ১৮ বছরের তরুণ আরিফ মিয়া আশরাফ এই প্রতিবেদকের কাছে পুরো জালিয়াতির সত্যতা স্বীকার করেছেন। আরিফ বলেন, তাঁর বিদেশে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনাই নেই। সানু মিয়া ও তাঁর ভাতিজারা বলেছিল শুধু চেয়ারে গিয়ে বসে থাকতে হবে, তাহলে এক হাজার টাকা দেবে। না বুঝেই এক হাজার টাকা আর এক প্যাকেট বিরিয়ানির লোভে তিনি সেখানে অভিনয় করতে গিয়েছিলেন।
একই চিত্র দেখা গেছে দ্বিতীয় ভিডিওটির ক্ষেত্রেও, যেখানে ‘কানাডাগামী দম্পতি’ হিসেবে যাদের দেখানো হয়েছে, তাদের একজন তারেক আহমেদ পেশায় দিনমজুর। আর তাঁর পাশে স্ত্রী হিসেবে সাজানো নারীটি প্রকৃতপক্ষে তারেকের প্রতিবেশী ও সম্পর্কে তাঁর খালা। প্রতারণার শিকার দিনমজুর তারেক চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গ্রামেরই এনামুল নামের এক ব্যক্তি তাঁদের সিলেটের ওই এজেন্সিতে নিয়ে গিয়েছিল এবং সেখানে অভিনয় করিয়ে তাঁদের হাতে মাত্র এক হাজার টাকা গুঁজে দেওয়া হয়। এগুলো যে এত বড় চরম মিথ্যা আর ধোঁকাবাজি, তা সরল বিশ্বাসে তাঁরা বুঝতেই পারেননি। অনুসন্ধানে এটি এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, হবিগঞ্জের এনামুল ও নাজমুল নামের দুই সহোদর গ্রাম থেকে টাকার লোভে অবুঝ ও অভাবী মানুষকে ফুসলিয়ে সিলেটে তাদের চাচার এজেন্সিতে অভিনয়ের জন্য নিয়ে আসত। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত এনামুল ও নাজমুলের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই তারা তাৎক্ষণিক সংযোগ কেটে দেন।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সিলেট নগরের উপশহরের সি ব্লকে অবস্থিত ‘অ্যামেক্স অ্যাসোসিয়েটস’-এর অফিসে গিয়ে দেখা যায় এক চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। সুসজ্জিত অফিসের ভেতরে তখন প্রতারিত ও ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের সঙ্গে উচ্চবাচ্য ও চরম দুর্ব্যবহার করছিলেন সিইও ইমন উদ্দিন। সেখানে অপেক্ষমাণ সুনামগঞ্জ থেকে আসা এক দম্পতি জানান, ফেসবুকে সহজে ও দ্রুত ভিসা পাওয়ার চোখধাঁধানো ভিডিও দেখেই তাঁরা জীবনের সব সঞ্চয় নিয়ে এই এজেন্সির দ্বারস্থ হয়েছিলেন। প্রথমে সাধারণ গ্রাহক সেজে কথা বললে সিইও ইমন উদ্দিন এই প্রতিবেদককেও আকাশকুসুম প্রলোভন ও মিথ্যা আশ্বাসের মায়াজাল দেখানোর চেষ্টা করেন। তবে পরবর্তীতে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তৈরি করা ভুয়া ভিডিওর মাধ্যমে প্রতারণার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করতেই নিজের খোলস বদলে ফেলেন ইমন। নিজেকে একটি রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের প্রভাবশালী নেতা পরিচয় দিয়ে তিনি প্রতিবেদককে সরাসরি হুমকি-ধমকি দেওয়া শুরু করেন এবং একের পর এক রাজনৈতিক নেতাকে ফোন করে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বন্ধের জন্য মরিয়া হয়ে জোর তদবির চালান। একপর্যায়ে বেগতিক দেখে ফ্রেশ হওয়ার অজুহাতে ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বলে অফিসের পেছনের দরজা দিয়ে চম্পট দেন এই প্রতারক চক্রের হোতা। পরবর্তীতে তিনি তাঁর নিজস্ব লোকজনের মাধ্যমে বড় অঙ্কের আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে পুরো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি ‘ম্যানেজ’ করার এক লজ্জাজনক ও নিকৃষ্ট প্রস্তাবও পাঠান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গভীর অনুসন্ধানে সিলেটজুড়ে আরও অসংখ্য কথিত লাইভ ও ট্রাভেল এজেন্সির সন্ধান মিলেছে, যারা হুবহু একই কায়দায় সাজানো ভিডিও ও কৃত্রিম রিভিউয়ের ফাঁদ পেতে বসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, ভুয়া গ্রাহকদের আসল পরিচয় গোপন রাখতে সুকৌশলে মুখে মাস্ক পরিয়েও রিভিউ নেওয়া হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তৈরি এই ডিজিটাল প্রতারণার শেষ পরিণতি হচ্ছে সাধারণ মানুষের জন্য ভয়াবহ এক অন্ধকার। বিদেশ যাওয়ার অন্ধ মোহে পড়ে কেউ পৈতৃক জমি বিক্রি করছেন, কেউ চড়া সুদে ঋণ নিচ্ছেন, আবার কেউ ধার-দেনা করে লাখ লাখ টাকা তুলে দিচ্ছেন এই সিন্ডিকটের হাতে।
এ বিষয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি-মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম প্রথম সিলেটকে বলেন, প্রবাসে নেওয়ার নামে কোনো ভুয়া বা লাইসেন্সবিহীন এজেন্সি খুলে প্রতারণার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলেই পুলিশ অত্যন্ত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। আমাদের সাদা পোশাকের বিশেষ গোয়েন্দা দলও এই সাইবার জালিয়াতি ও ভুয়া এজেন্সির খোঁজে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত অনুসন্ধান চালাচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে, যাতে চটকদার বিজ্ঞাপন, সুন্দরী কর্মী বা অফিসের জাঁকজমক দেখে কেউ এমন মরণফাঁদে পা না দেন।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: