কেটে ফেলা গাছ যখন ‘উঠে দাঁড়াল’!

কেটে ফেলা গাছ যখন ‘উঠে দাঁড়াল’!

প্রথম ডেস্ক

০৫/০৬/২০২৬ ২১:৩৭:১৫

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

প্রেমিক-প্রেমিকা রাগ করে ব্রেকআপ করার পর আবার সম্পর্কে ফিরে আসার গল্প আমরা অনেকেই শুনেছি। কিন্তু ঝড়ে উপড়ে পড়া এবং কুড়াল দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলার পর কোনো গাছ রাগ করে আবার ‘উঠে দাঁড়িয়ে’ নিজের স্ট্যাটাস ‘অ্যালাইভ’ করে ফেলেছে—এমন কথা কি কেউ কোনোদিন শুনেছেন? শুনতে রূপকথার গল্প মনে হলেও, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার মোগড়া এলাকায় ঠিক এমন এক হুলস্থুল কাণ্ড ঘটিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কাঁপিয়ে দিচ্ছে এক ‘জেদি’ গাছ!


ঘটনার সূত্রপাত মাস দেড়েক আগে, যখন এক কালবৈশাখী ঝড়ে গাছটি ধপাস করে মাটিতে পড়ে যায়। তখন মালিকপক্ষ ভাবলেন, গাছটি যেহেতু কেটেই পড়েছে, তা দিয়ে লাকড়ি বানিয়ে ফেলা যাক। যেই ভাবা সেই কাজ—কুড়াল দিয়ে কোপ পার্ট টু পার্ট করে গাছের ডালপালা কেটে সাবাড় করা হলো। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে মোগড়া এলাকার মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ কপালে তুলে দেখছেন—কেটে ফেলা সেই গাছের অবশিষ্টাংশ নাকি এক রাতে আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে! একদম জ্যান্ত গাছের মতো বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে সে যেন কাঠুরেদের খেঁকিয়ে বলছে, "কী ভেবেছিলে? এত সহজেই লাকড়ি হয়ে যাব?"


ব্যস! আর যায় কোথায়? এই "অলৌকিক গাছ"-এর খবর ছড়িয়ে পড়তেই দলে দলে মানুষ ছুটছেন মোগড়ার দিকে। অলৌকিকতার হুজুগে পড়ে শত শত মানুষ এখন ভিড় করছেন গাছটি দেখতে। কৌতূহলী ও অন্ধবিশ্বাসী মানুষ গাছের গোড়ায় মোমবাতি জ্বালাচ্ছেন, কেউবা আবার আগরবাতি দিয়ে ধোঁয়া দিয়ে গাছের ‘মান ভাঙানোর’ চেষ্টা করছেন। অতি-উৎসাহী কিছু মানুষ তো এক কাঠি ওপরে গিয়ে ভাবছেন—এই গাছের শিকড়-বাকল বুঝি সব রোগের ‘মহৌষধ’! তাই তারা মানত করে গাছের ছাল-বাকল খুবলে নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে। গাছটি যেন এখন রাতারাতি সেলিব্রেটি বনে গেছে, তাকে এক নজর দেখতে, তার সাথে সেলফি তুলতে এবং সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য রিলস বানাতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন।


তবে সাধারণ মানুষের এই অলৌকিক কাণ্ডে বালতি বালতি ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়েছেন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, গাছটির এই উঠে দাঁড়ানোর পেছনে কোনো জিন-ভূতের আছর বা অলৌকিক জাদুটোনা নেই, বরং আছে নিখাদ পদার্থবিজ্ঞানের কেরামতি! যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায় ‘রুট স্প্রিংব্যাক’ (Root Springback) বা ‘গাছের ইলাস্টিক পাওয়ার’।


বিজ্ঞানীরা পুরো থিওরিটা বুঝিয়ে বলেছেন যে, গাছটি যখন ঝড়ে উপড়ে পড়েছিল, তখনো তার মাটির নিচের শক্তিশালী কিছু শিকড় উপড়ে যায়নি। সেগুলো ধনুকের ছিলার মতো প্রচণ্ড টানের (Tension) মধ্যে মাটির নিচে আটকে ছিল। ডালপালাসহ বিশাল গাছের ওজন যতক্ষণ ছিল, ততক্ষণ শিকড়ের ওই টান গাছটিকে সোজা করতে পারছিল না। কিন্তু যখনই কাঠুরেরা ওপরের ভারী ডালপালা আর গুঁড়ি কেটে লাকড়ি বানিয়ে সরিয়ে ফেলল, অমনি গোড়ার ওপর থেকে ওজনের চাপ একবারে জিরো হয়ে গেল। ওজন কমতেই মাটির নিচের টানটান হয়ে থাকা শিকড়গুলো স্প্রিং-এর মতো ছিটকে গাছের অবশিষ্ট গোড়াটিকে আচমকা ঝটকা মেরে আবার আগের জায়গায় সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিল।


সহজ কথায়, একটা প্লাস্টিকের স্কেলকে হাত দিয়ে চেপে বাঁকা করে রাখলে যেমন বাঁকা থাকে, হাত ছেড়ে দিলে ধপ করে সোজা হয়ে যায়—মোগড়ার গাছটির ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে। সুতরাং, গাছটি আসলে কোনো অলৌকিক ক্ষমতাবলে জ্যান্ত হয়নি; সে স্রেফ বিজ্ঞানের নিয়ম মেনে একটা পারফেক্ট ব্যাকফ্লিপ দিয়েছে মাত্র! তাই রোগমুক্তির অন্ধ আশায় গাছের ছাল-বাকল চিবিয়ে নিজের পেটের বারোটা না বাজিয়ে, মোগড়ার এই "স্প্রিং-গাছ"কে বিজ্ঞানের এক দারুণ ও কৌতূহলোদ্দীপক উদাহরণ হিসেবে দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।



মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন: