অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে নতুন আইন: সর্বোচ্চ ১০ বছরের জেল, ৫ কোটি টাকা জরিমানা
দেশে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার বিস্তার রোধে কঠোর ও নতুন আইন প্রণয়ন করেছে সরকার। বুধবার (১ জুলাই) আইনটি জারি করে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়েছে এবং প্রকাশের সাথে সাথেই এটি দেশজুড়ে কার্যকর হয়েছে। এই নতুন আইন কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত দীর্ঘদিনের পুরোনো ‘পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭’ আনুষ্ঠানিকভাবে রহিত হলো।
নতুন এই আইনে প্রথমবারের মতো অনলাইন জুয়া, অনলাইন বেটিং, স্পোর্টস বেটিং, ফ্যান্টাসি বেটিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেট, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ম্যাচ ফিক্সিং এবং স্পট ফিক্সিংয়ের মতো ডিজিটাল অপরাধের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এসব কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
আইনের বিধান অনুযায়ী, সাধারণ জুয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা ১ কোটি টাকা জরিমানা করা যাবে। এছাড়া অনলাইন বেটিং, বুকমেকার হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা, ভিপিএন বা মিরর সাইট ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা কিংবা ডিজিটাল অবকাঠামোর মাধ্যমে জুয়ার নেটওয়ার্ক পরিচালনার অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা জরিমানা এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আদালত দোষী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা স্থায়ীভাবে সংশ্লিষ্ট খেলায় অযোগ্য ঘোষণা করতে পারবেন। পাশাপাশি জুয়ার বিজ্ঞাপন, প্রচারণা, স্পন্সরশিপ বা রেফারেল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে জুয়ার প্রসারে অংশ নিলে গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী কিংবা খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড অথবা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে।
অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র, বায়োমেট্রিক তথ্য, ভুয়া সিম বা ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনার অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে এই অপরাধ করলে সাজা আরও বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা করার কথা বলা হয়েছে।
আইনে জুয়ার অর্থ ব্যাংক, এমএফএস, হাওলা বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে স্থানান্তর বা বৈধ করার চেষ্টাকে 'মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২'-এর সম্পৃক্ত অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন আইনে অপরাধে ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব, ডিজিটাল ওয়ালেট, সার্ভার, ডোমেইন, সিম, ডিভাইসসহ জুয়ার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত ভবন বা অফিস আদালতের আদেশে বাজেয়াপ্ত করা যাবে। কোনো কোম্পানি এতে জড়িত থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়ী করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত করা যাবে।
আইনে বলা হয়েছে, অনলাইন জুয়া ও সাইবার স্পেসের অপরাধের বিচার সাইবার ট্রাইব্যুনালে হবে। এসব অপরাধ আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপস অযোগ্য। সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিচে নন, এমন পুলিশ কর্মকর্তা আদালতের অনুমতি নিয়ে ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে ফ্রিজ করতে পারবেন।
এছাড়া অনলাইন জুয়া শনাক্ত ও প্রতিরোধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন (ডিপিআই) এবং ট্রানজ্যাকশন মনিটরিং সিস্টেমের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সরকারকে। আইন বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ, সিআইডি এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পূর্ববর্তী আইনের অধীনে চলমান মামলা ও কার্যক্রম নতুন আইনের বিধান অনুযায়ী অব্যাহত থাকবে বলেও জানানো হয়েছে।
তাহির আহমদ/ মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: