হবিগঞ্জের তৃপ্তির বাস্তব জীবন ‘আসমানী’ এর মতোই
আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও/ রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।"
পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের সেই বিখ্যাত কবিতার ‘আসমানী’র চরিত্রটি যেন আজও জীবন্ত রূপ নিয়ে বেঁচে আছে হবিগঞ্জের প্রত্যন্ত জনপদে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাস্তবতার নির্মম কষাঘাতে জর্জরিত তৃপ্তি ব্রহ্মচারীর ভাগ্যে আজও জোটেনি মাথা গোঁজার মতো একটি নিরাপদ আশ্রয়।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ৪ নম্বর পৈল ইউনিয়নের পশ্চিমপাড়া ব্রাহ্মণপাড়ায় গেলে চোখে পড়ে এক বুকভাঙ্গা দৃশ্য। একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে ছোট্ট কন্যাসন্তানকে নিয়ে চরম মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তৃপ্তি ব্রহ্মচারী। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, সামান্য ঝড় কিংবা প্রবল বৃষ্টিতেই বুঝি হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে পুরো ঘরটি।
ঘর বলতে শুধুই কয়েকটি বাঁশের খুঁটি, মরিচা ধরা তালি দেওয়া টিন, ছেঁড়া পলিথিন আর পুরোনো কাপড় দিয়ে কোনো রকমে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জীর্ণ কাঠামো। টিনের চালজুড়ে অসংখ্য ছিদ্র। একটু বৃষ্টি শুরু হলেই ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে ঘরের প্রতিটি কোণে। তখন আর তাকে ঘর বলার উপায় থাকে না; পুরো ঘরটাই যেন বৃষ্টির পানিতে ভিজে একাকার হয়ে যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বৃষ্টির ছাটে ঘরের মেঝে কাদায় থিতিয়ে গেছে। বিছানা, বালিশ, কাপড়-চোপড় থেকে শুরু করে হাঁড়ি-পাতিল, চাল-ডাল সবই ভিজে একাকার। ঘরের ভেতর কোনো শুকনো জায়গা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এক কোণ থেকে আরেক কোণে অসহায়ভাবে ছুটে বেড়ান তৃপ্তি ব্রহ্মচারী। কখনও নিজের পরনের কাপড় দিয়ে, কখনও পুরোনো প্লাস্টিক টেনে পানি ঠেকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রকৃতির এই অমোঘ লড়াইয়ে প্রতিবারই তাকে হার মানতে হয়।
রাত নামলে কিংবা মেঘের ডাক শুনলে আতঙ্ক আরও ঘনীভূত হয়। সামান্য ঝড় উঠলেই বুকের সঙ্গে অবুঝ মেয়েটিকে লেপ্টে ধরে সারারাত নির্ঘুম কাটান মা। ভয় একটাই—এই বুঝি মাথার ওপর ভেঙে পড়ল শেষ আশ্রয়টুকু।
অশ্রুসিক্ত চোখে তৃপ্তি ব্রহ্মচারী বলেন, "বৃষ্টি শুরু হলেই দুচোখে আর ঘুম আসে না। সারারাত মেয়েটাকে কোলে নিয়ে বসে থাকতে হয়। বিছানা ভিজে যায়, কাপড় ভিজে যায়। কোথাও একটু শুকনো জায়গা থাকে না গা জিরোবার। ঝড় এলে মনে হয়, আজ বুঝি ঘরটা ভেঙেই পড়বে। তখন শুধু সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, যেন মেয়েটাকে নিয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকতে পারি।"
বাসস্থানের এই সংকটের পাশাপাশি জীবনযুদ্ধটাও তার জন্য সমান নিষ্ঠুর। দিনমজুরি আর মানুষের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর ভর করে কোনো রকমে চলে মা-মেয়ের এই ভাঙা সংসার। প্রতিদিন কাজ জোটে না, ফলে অনেক দিন দুবেলা খাবারও জোটে না তাদের কপালে। যেখানে প্রতিদিনের আহার জোগাড় করাই এক মহাসংগ্রাম, সেখানে ঘর মেরামত বা নতুন একটি ঘরের স্বপ্ন দেখা তাদের জন্য চরম বিলাসিতা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই চরম অবর্ণনীয় কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন এই অসহায় নারী। এলাকার সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত উদ্যোগে কখনও চাল, কখনও কাপড় কিংবা সামান্য অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছেন। কিন্তু এই সাময়িক সহায়তায় তার স্থায়ী সংকটের কোনো সমাধান হয়নি। একটি নিরাপদ টেকসই ঘর ছাড়া এই পরিবারটির দুর্ভোগ শেষ হওয়ার নয়।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, দেশের এত উন্নয়নের ভিড়েও যদি একজন মা ও তার ছোট্ট সন্তানকে এমন অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘরে রাত কাটাতে হয়, তবে সেই সুফল তাদের কাছে কতটুকু পৌঁছেছে?
একটি নিরাপদ মাথা গোঁজার ঠাঁই, দুবেলা পেটপুরে খাবার, মেয়েটির একটু লেখাপড়ার সুযোগ আর সমাজের একটু আন্তরিক সহমর্মিতা—এটুকুই এখন তৃপ্তি ব্রহ্মচারীর জীবনের একমাত্র আকুতি। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং মানবিক সংগঠনগুলোর প্রতি এলাকাবাসীর জোরালো আহ্বান—আসুন, এই অসহায় মা ও মেয়ের পাশে দাঁড়াই। আমাদের সামান্য একটু সহায়তাই হয়তো বদলে দিতে পারে দুটি বিপন্ন মানুষের পুরো জীবন।
ফয়সল চৌধুরী / তানজুবা তাবাসসুম
মন্তব্য করুন: