হয়রানী ও দুর্নীতির মহোৎসব শ্রীমঙ্গল সাব-রেজিষ্ট্রার অফিস
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে জমি রেজিষ্ট্রি করতে টিন সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক- এমন অজুহাত দাঁড় করিয়ে সাধারণ জমি ক্রেতা-বিক্রেতাদের হয়রানী ও অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে টিন সার্টিফিকেট বা আয়কর রিটার্ন জমা ছাড়াই জমি রেজিষ্ট্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। শ্রীমঙ্গল সাব রেজিষ্ট্রি অফিসের এক শ্রেণীর অসৎ কর্মকর্তা কর্মচারী ও জমি রেজিষ্ট্রিকে ঘিরে গড়ে উঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট আইনের মারপ্যাচে ফেলে সাধারণ জমি ক্রেতাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।
সম্প্রতি শ্রীমঙ্গল শহরের ষ্টেশন এলাকার আতাউর রহমানের স্ত্রী দিলারা বেগম নামে এক বিক্রেতার ১০ শতাংশ জমি বায়না রেজিষ্ট্রি করতে গিয়ে জানতে পারেন জমি বিক্রি করতে আয়কর সনদ ও রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক। দিলারা বেগম জানান তার নামে কোন আয়কর সনদ না থাকায় তিনি বিপাকে পড়েন। পরে টিন সার্টিফিকেট না থাকার অজুহাতে এক কর্মকর্তা তার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। ওই কর্মকতা তাকে আয়কর সনদ বা রিটার্ন ছাড়াই জমি বায়না রেজিষ্ট্রি করে দেয়ার প্রস্তাব দেন। পরবর্তিতে ৩০ হাজার টাকায় দফারফা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গত ২৪ মে দিলারা বেগম ৬০ লক্ষ টাকা মূল্য ধার্যে ১০ শতক জমি ৩০ লাখ টাকায় এই বায়না রেজিষ্ট্রি সম্পন্ন করেন। দলিল নং ২৩৫০।
বাংলাদেশ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে- ২০২৩ সালের এক আইনের ২৬৪(৭) ধারা মতে পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন কর্পোরেশন এবং ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায় ১০ লক্ষ টাকার উপরে জমি রেজিস্ট্রি করতে আয়কর সনদ থাকা এবং রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক।
অভিযোগ উঠেছে-টিন সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করার এই আইনকে অজুহাত বানিয়ে রেজিষ্ট্রি অফিসের দুনীর্তিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জমি ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- কেবল টিন সার্টিফিকেট জটিলতা নয়, জমির শ্রেণী, মূল্য কম বেশী দেখিয়ে সাব রেজিস্ট্রি অফিসের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠা এই সিন্ডিকেট সেবাগ্রহীতাদের নানা ভাবে জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। ফলে সরকার বিপুল পরিমান রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একইভাবে দলিলে সামান্য ভুলের জন্য ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ারও অভিযোগ করেছেন অনেক জমি ক্রেতা।
গতকাল শ্রীমঙ্গল সাব রেজিস্ট্রি অফিসে আসা বেশ কিছু জমি ক্রেতা বিক্রেতার সাথে আলাপ করে জানা গেছে- সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের জমির দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রে জমি বিক্রেতার স্বত্ব নিশ্চিত করার জন্য পর্চা, খাজনা-খারিজ, এনআইডি, ছবিসহ আনুষঙ্গিক কাগজপত্র নিশ্চিত হওয়ার পর সরকারি রেজিস্ট্রেশন ফি ১ হাজার ১শ’ টাকা ও ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রে দলিল মূল্যের সাড়ে ৭ ভাগ ও পৌর এলাকায় সাড়ে ৯ ভাগ হারে কর জমা দিতে হয়। কিন্তু সেই নিয়ম মানা হয় না। নানা ফাঁক ফোকর বের করে তাদের কাছ থেকে অর্থ দাবী করা হয়। ঘুষ না দিলে জমি রেজিষ্ট্রি আটকে দেয়া হয়।
শ্রীমঙ্গল সাব রেজিষ্ট্রি অফিসের সাব রেজিষ্ট্রার শংকর কুমার ধর বলেন, ‘পৌরসভার মধ্যে কোন জমি রেজিষ্ট্রি করতে রিটার্ন জমা বাধ্যতা মূলক। রিটার্ন জমা না দিলে অপেক্ষায় থাকতে হবে’। তবে- টিন সনদ না থাকা সত্বেও জমি রেজিস্ট্রি বিষয়ে জানতে চাইলে সাব রেজিস্ট্রার বলেন, ‘গত কাল (৮ জুলাই) এমন একটা দলিল করা হয়েছে, আমাদের প্রীতম দাসের (এনসিপি নেতা) সুপারিশ-এ, এনিয়ে অফিসে হিচিং হয়েছে-পরিবেশ অশান্ত হয়েছে, বুঝেন তো সবাই তো যার যার গায়ের জোর দেখাতে শুরু করে... তবে এজন্য কোন টাকা নেয়া হয়নি’ বলে জানান। দিলারা বেগমের জমি রেজিস্ট্রি করতে ৩০ হাজার টাকা নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আজ আমি অফিসে নেই- রোববার অফিসে এসে খোঁজ নেবেন’ বলে জানান।
এনিয়ে মৌলভীবাজার জেলা রেজিষ্ট্রারকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অথৈ/ ডিডি
মন্তব্য করুন: