সিলেটে ট্রিপল মার্ডারে বাবুল মিয়ার গ্রেপ্তার ও এজাহারের ফারাক!
সিলেটে বয়স্ক স্বামী-স্ত্রী ও গৃহকর্মী এই তিনজনকে হত্যার ঘটনায় বাবুল মিয়া নামে একজনকে গ্রেপ্তারের খবর সামনে আসার পর ঘটনাটি ঘিরে নতুন করে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে যে ঘটনাপ্রবাহ, দীর্ঘদিনের বিরোধ, হুমকি এবং সম্ভাব্য হত্যার আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে, তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা কী—এই প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিহতদের পরিবারের সদস্য সেলিনা সুলতানা সম্প্রতি থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, হত্যাকাণ্ডের পেছনে একটি দীর্ঘস্থায়ী ভূমি ও মামলা-সংক্রান্ত বিরোধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকায় তাঁদের পরিবারের দখলে থাকা জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ বিরোধকে কেন্দ্র করে একাধিক মামলা, পাল্টা মামলা, আদালতে বিচারাধীন বিষয় এবং মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকির অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ১৯৯৭ সালে অভিযোগকারী ও তাঁর বাবা পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির কাছ থেকে রিকাবীবাজারের সরষপুর এলাকায় প্রায় ১২ শতক জমি লিজ নিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। অভিযোগে একজন আইনজীবী ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জমি দখলের চেষ্টা, মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ এবং বিভিন্ন সময়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগ অবশ্য সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যাচাইযোগ্য।
লিখিত অভিযোগের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো—হত্যাকাণ্ডের আগে একাধিক হুমকি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগে ২০২৫ সালের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে মামলা প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে বিরোধের পর হামলার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ এবং পরবর্তীতে আদালতে মামলা করার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
এরপরও অভিযোগপত্রে ১২ আগস্ট ২০২৬ সালের ঘটনাকে একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওইদিন সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার একটি বাসায় পেশাদার ভাড়াটিয়া খুনিদের মাধ্যমে অভিযোগকারীর বৃদ্ধ বাবা এম.এ. সাত্তার, মা সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর বাসা থেকে বিভিন্ন কাগজপত্র, জিডির কপি ও দলিলপত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এই বর্ণনা যদি তদন্তে সত্যতা পায়, তাহলে হত্যাকাণ্ডটি নিছক আকস্মিক বা ব্যক্তিগত বিরোধের ঘটনা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের আগে কারা হুমকি দিয়েছিল, কার সঙ্গে নিহতদের বিরোধ ছিল, হত্যার দিন কারা ঘটনাস্থলের আশপাশে ছিল, বাসা থেকে কী কী জিনিস নেওয়া হয়েছিল এবং হত্যার পর সেগুলোর কোনো হদিস পাওয়া গেছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত। এখানেই বাবুল মিয়ার গ্রেপ্তার নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
পুলিশ যদি তাঁকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে থাকে, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কী? তিনি হত্যাকাণ্ডের আগে বা পরে কোথায় ছিলেন? নিহত পরিবারের সঙ্গে তাঁর পূর্বপরিচয় বা বিরোধ ছিল কি? তাঁর সঙ্গে অন্য কোনো সন্দেহভাজনের যোগাযোগ ছিল কি? ঘটনাস্থল, মোবাইল ফোনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য কিংবা ফরেনসিক আলামতে তাঁর উপস্থিতির কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কি?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—নিহত পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় দেওয়া অভিযোগে হত্যাকাণ্ডের পূর্বাপর যে ব্যক্তিদের বিষয়ে বিস্তারিত আশঙ্কা ও বিরোধের কথা বলা হয়েছে, সেই বয়ানের সঙ্গে বাবুল মিয়ার গ্রেপ্তারের যোগসূত্র কোথায়?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। কোনো লিখিত অভিযোগে কারও নাম না থাকা মানেই তিনি নির্দোষ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন ঠিক নয়, তেমনি শুধু গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেই তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত—এমন সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্য নয়। গ্রেপ্তার তদন্তের একটি ধাপ; অপরাধের দায় প্রমাণ করতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ও আইনসম্মত সাক্ষ্য-প্রমাণ।
এই মামলায় তাই তদন্তকারীদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মোটিভ, সুযোগ এবং প্রমাণের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট যোগসূত্র তৈরি করা।
নিহত পরিবারের অভিযোগপত্রে যে দীর্ঘদিনের জমি ও মামলা-সংক্রান্ত বিরোধের কথা এসেছে, সেটিও তদন্ত থেকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে বাবুল মিয়ার বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে কী তথ্য এসেছে, কোন সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তাঁকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে কী ধরনের বস্তুগত প্রমাণ রয়েছে—এসবও জনসম্মুখে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
কারণ এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের নিরাপত্তা, দীর্ঘদিনের আইনি বিরোধ এবং তিনটি প্রাণহানির বিচার পাওয়ার প্রশ্ন।
সিলেটের এই আলোচিত ট্রিপল মার্ডারের তদন্তে তাই জনমতের চাপ নয়, প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক তদন্ত। কে আগে হুমকি দিয়েছিল, কার স্বার্থে হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে, কারা ঘটনাস্থলে গিয়েছিল, হত্যার পর কারা লাভবান হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কার সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া যায়—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে।
বাবুল মিয়া সত্যিই হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না, তা তদন্ত ও আদালতই নির্ধারণ করবে। কিন্তু নিহত পরিবারের লিখিত অভিযোগে উঠে আসা পূর্বাপর ঘটনাগুলো যদি তদন্তে যথাযথভাবে যাচাই না করা হয়, তাহলে মামলাটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
অতএব, এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো—গ্রেপ্তার নয়, গ্রেপ্তারের পেছনের প্রমাণ প্রকাশ করা; অভিযোগ নয়, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা; এবং কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দায়ী করার আগে হত্যাকাণ্ডের পুরো নেপথ্য উন্মোচন করা।
তিনটি প্রাণের বিচার নিশ্চিত করতে তদন্তের প্রতিটি ধাপ হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: