ভূমধ্যসাগর ট্রাজেডি: উদ্ধার ২৯ জনের ২৪ জনই সিলেটের

ফের একই রুটে রক্তক্ষরণ

ভূমধ্যসাগর ট্রাজেডি: উদ্ধার ২৯ জনের ২৪ জনই সিলেটের

হাসান কবির চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধি

২১/০৮/২০২৬ ১৭:৪১:০৬

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিস যাওয়ার পথে মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে উদ্ধার হওয়া ২৯ বাংলাদেশি নাগরিকের মধ্যে ২৭ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। আশঙ্কাজনক খবর হলো, তাদের মধ্যে ২৪ জনই সিলেট বিভাগের বাসিন্দা। সাগরে ১০ দিন ভাসমান থাকার পর উদ্ধার হওয়া এই দলটি বর্তমানে মিশরের স্থানীয় পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। একই ঘটনায় সাগরে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং মিশরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ও উপকূল থেকে আরও দুই অভিবাসীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে সিলেট অঞ্চলের তরুণদের প্রাণহানি ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ইউরোপের রঙিন স্বপ্নের প্রলোভনে পড়ে অবৈধ মানবপাচার চক্রের খপ্পরে পড়ে এর আগেও একাধিকবার এমন ভয়াবহ ট্রাজেডির শিকার হয়েছেন এই অঞ্চলের যুবকেরা।

পূর্বের ভয়াবহ কিছু ঘটনার মধ্যে রয়েছে, মে ২০১৯ লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে তিউনিসিয়া উপকূলে নৌকা ডুবে অন্তত ৩৭ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারান, যার মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন সিলেট ও সুনামগঞ্জের অধিবাসী। ফেব্রুয়ারি ২০২৪ লিবিয়া থেকে ইউরোপ যাওয়ার পথে উপকূলীয় অঞ্চলে ট্রলার ডুবে প্রাণ হারান বহু অভিবাসী, যেখানে সিলেটের একাধিক উপজেলার যুবক নিখোঁজ ও নিহত হন।

লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে অমানবিক নির্যাতন সহ্য করা এবং দেশে স্বজনদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা সিলেট অঞ্চলে নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে। বারবার সচেতনতামূলক প্রচার চালানো এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও মানবপাচারকারী ‘দালাল’ চক্রের তৎপরতা থামেনি।

ভাগ্যক্রমে জীবিত উদ্ধার হওয়া সুনামগঞ্জের আব্দুল করিম জানান, গত ৩ আগস্ট মানবপাচার চক্রের সহায়তায় লিবিয়ার তবুক এলাকা থেকে নৌকায় ওঠেন তারা। মাঝপথে ইঞ্জিন বিকল হয়ে নৌকাটি দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘ ১০ দিন খাবার ও পানি ছাড়া সাগরে ভাসার পর ১৩ আগস্ট এটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে ভেড়ে। সাগরেই মারা যান অন্তত ৯ জন বাংলাদেশি, যাদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।

স্থানীয় প্রশাসন অসুস্থদের হাসপাতালে ভর্তি করে। মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (শ্রম) মো. জাকির হোসেন জানান, চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের মেহেদি হাসান নামে একজন মারা যান এবং পরবর্তীতে উপকূল থেকে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

উদ্ধার প্রাপ্তদের তালিকা (সিলেট বিভাগ):

সুনামগঞ্জ (১৭ জন): সদর উপজেলার তায়েবুর রহমান, মো. মাহফুজ মিয়া, মো. লোহানী আহমেদ, বদর উদ্দিন, সোহেল মিয়া, মো. হোসাইন আহমেদ, আলিম উদ্দিন, সাব্বির হোসেন তালহা, এনাম উদ্দিন, আবু সাঈদ এয়য়াহিয়া, আব্দুল করিম ও মো. মামুন খান। দিরাইয়ের নাইম আহমেদ। জগন্নাথপুরের সাইদুল ইসলাম, মো. হোসাইন মিয়া, আরিফ আহমেদ ও হুজাইফা বিন হোসাইন এবং ছাতকের তোফায়েল আহমেদ।

হবিগঞ্জ (৩ জন): সদরের মোস্তাকিন ভূঁইয়া এবং আজমিরীগঞ্জের সোহেল মিয়া ও রিয়াজ উদ্দিন আহমদ।

সিলেট জেলা (৩ জন): গোয়াইনঘাটের তানভীর হোসেন এবং বিয়ানীবাজারের রাজু মিয়া ও নজরুল ইসলাম।

সিলেট বিভাগের বাইরে রয়েছেন মাদারীপুরের মো. ফারুক, কিশোরগঞ্জের সায়মন মিয়া এবং ভৈরবের মহরম আলী। চিকিৎসাধীন আরও দুজনের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এছাড়া শামীম আহমেদ ও হাবিব উল্লাহর এনআইডি এবং হৃদয় পাল, মো. হাবিব উল্লাহ ও নুর আলমের পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়েছে।

মিশরের আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে আটক বাংলাদেশিদের দেশে ফেরত আনা এবং মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে দূতাবাস।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সিলেটের গ্রামীণ জনপদগুলোতে সক্রিয় দালাল চক্র অল্প সময়ে ইউরোপ পৌঁছানোর লোভ দেখিয়ে অভিভাবকদের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বারবার ভূমধ্যসাগরে তাজা প্রাণ ঝরে গেলেও থামছে না এই আত্মঘাতী যাত্রা।

আর আর

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad