মৌলভীবাজারে জোড়া সংঘাত: অডিও রেকর্ডে কিশোর গ্যাংয়ের মাস্টারমাইন্ডের সন্ধান

মৌলভীবাজারে জোড়া সংঘাত: অডিও রেকর্ডে কিশোর গ্যাংয়ের মাস্টারমাইন্ডের সন্ধান

কামরান আহমদ, মৌলভীবাজার

২১/০৮/২০২৬ ১৮:০৩:২০

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

মৌলভীবাজার জেলা শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতির দিকে ঠেলে দেওয়া উদীয়মান কিশোর গ্যাংগুলোর নেপথ্যে সচল রয়েছে এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। গত ১২ জুলাই ২০২৪ তারিখে শহরের অত্যন্ত পরিচিত ও জনবহুল দুটি এলাকা—চৌমুহনা এবং কুসুমবাগে সংঘটিত হয় জোড়া রক্তক্ষয়ী সহিংসতার ঘটনা। উক্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের অভিযানে আটক গ্যাং সদস্যের ডিজিটাল আলামত থেকে উন্মোচিত হয়েছে অপরাধ জগতের চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। জব্দকৃত আলামত ও ফাঁস হওয়া ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে কিশোর অপরাধীদের মূল ছায়াদাতা হিসেবে বারবার উঠে আসছে শহরের বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব এহসান জাকারিয়ার নাম।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা যায়, ১২ জুলাই মৌলভীবাজারের চৌমুহনা ও কুসুমবাগ এলাকায় সুপরিকল্পিতভাবে পৃথক দুটি হামলার ঘটনা ঘটে। সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলায় আহতদের মধ্যে একজন বর্তমানে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং অন্যজন গুরুতর শারীরিক জখম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন।

ঘটনার পরপরই পুলিশ এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে হাসান নামক এক সক্রিয় কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। আটক হাসানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করে তল্লাশি চালানো হলে পুলিশ এক জট পাকানো অপরাধ নেটওয়ার্কের সন্ধান পায়। উদ্ধারকৃত ডাটা থেকে বেরিয়ে আসে বিভিন্ন দিনের কথোপকথনের অডিও কল রেকর্ড, হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েস নোট এবং অপরাধীদের গোপন সংযোগের নানাবিধ অকাট্য প্রমাণ।

আলামত হিসেবে সংগৃহীত ফোনালাপ ও ভয়েস বার্তাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মৌলভীবাজারে কিশোর গ্যাং সংক্রান্ত একাধিক অপরাধে পূর্বেও সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা এহসান জাকারিয়া নিয়মিতভাবে এই গ্যাংগুলোকে পেছন থেকে পরিচালনা করতেন।

গ্যাং সদস্যদের কথোপকথন থেকে স্পষ্ট জানা যায়, যেকোনো বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে এহসান জাকারিয়া নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করে অপরাধীদের কাছে অস্ত্র পৌঁছে দিতেন। শুধু তা-ই নয়, হামলা চালানোর আগে বা পরে গ্যাং সদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া ও ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেওয়ার মতো পরিবহনের প্রত্যক্ষ যোগানদাতাও ছিলেন তিনি। অর্থের প্রলোভন ও আইনি সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তরুণদের অপকর্মে নামানো হতো বলে প্রমাণের ভিত্তিতে উঠে এসেছে।

উদ্ধারকৃত ভয়েস মেসেজের শোনা যায়-"তুই ভাইর লগে বেইমানি করছস... তুই অখন ওয়ান্টেড লিস্টে আছস। তোর নাম কাটি লিছিলাম, অখন আবার নতুন করি লেখানো হইছে। সায়েক বাদে অখন তুই লিস্টে পড়বি।"

কল রেকর্ডিংয়ের তথ্যমতে, গ্যাংয়ের কোনো সদস্য নির্দেশ অমান্য করলে বা সিন্ডিকেট থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হতো। তাদের অভ্যন্তরীণ ‘ওয়ান্টেড লিস্টে’ নাম অন্তর্ভুক্ত করে পরিণতি ভোগ করার হুমকি দেওয়া হতো নিয়মিত।

জব্দকৃত অডিও রেকর্ড ও তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, উক্ত সহিংস হামলার দিনে গ্যাংটির মূল ‘কিলিং টার্গেট’ ছিল প্রতিপক্ষ গ্রুপের নেতা শায়েক আহমেদ। তবে ঘটনার সময় শায়েক আহমেদ অন্য মামলায় কারাগারে আটক থাকায় অলৌকিকভাবে প্রাণঘাতী হামলা থেকে বেঁচে যান। স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তিনি বাইরে থাকলে সংঘাতের পরিণতি আরও ভয়াবহ বা প্রাণঘাতী হতে পারত।

মৌলভীবাজারের সাধারণ নাগরিক ও সচেতন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, কেবল মাঠপর্যায়ের দু-একজন অস্ত্রধারী কিশোরকে গ্রেফতার করে ক্ষান্ত থাকলে শহরের মূল অপরাধ হ্রাস পাবে না। গ্যাং কালচার থেকে জেলাকে পুরোপুরি মুক্ত করতে হলে এদের পেছনে থাকা মাস্টারমাইন্ড ও উস্কানিদাতা এহসান জাকারিয়াসহ সমস্ত নেপথ্য ‘গডফাদারদের’ আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পুলিশের হাতে জব্দ হওয়া আলামতগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব ডিজিটাল প্রমাণের নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে এবং গ্যাং পরিচালনা বা সহায়তায় যার নামই আসুক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধীদের শিকড় উপড়ে ফেলতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুতই পরবর্তী পদক্ষেপে যাচ্ছে।

আর আর

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad