একখণ্ড ভূমিতে সিলেটে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত
সাম্প্রদায়িকতার সংকীর্ণ কোলাহল আর অবিশ্বাসের ছায়া যখন চারপাশকে আচ্ছন্ন করে তোলে, ঠিক তখনই মৌলভীবাজারের জুড়ীতে রচিত হলো এক পরম উদারতার নীরব মহাকাব্য। যে যুগে স্বার্থের সমীকরণে মানবতার সংজ্ঞা প্রায় ধূসর, সেখানে ধর্মের কৃত্রিম প্রাচীর ডিঙিয়ে নিছক এক প্রতিবেশী প্রেমে উজ্জ্বল হয়ে উঠল একখণ্ড ভূমির আত্মত্যাগ।
গল্পটি স্বপ্নের আর অনিশ্চয়তার চরম এক দ্বন্দ্বের। এক তরুণ, যার চোখে আলো ছড়াচ্ছিল সোনালী ব্যাংকের সরকারি চাকরির অর্জিত সুযোগ। কিন্তু সেই স্বপ্নের মাঝে এক অদৃশ্য অর্গল হয়ে দাঁড়ায় রূঢ় বাস্তবতা—পরিবারের কোনো স্থাবর সম্পত্তি নেই, পরম আশ্রয়ের প্রদীপে জ্বলছে শুধুই দীর্ঘকালের ভাড়াটে জিন্দেগির ছাপ। চাকরি পাওয়ার আনন্দে যখন আনন্দের সুবাতাস বইবার কথা, ঠিক তখনই পুলিশ ভেরিফিকেশনের অমলিন বিধিমালার কাছে জমিহীনতার আক্ষেপে থমকে যাচ্ছিল তার অর্জিত ভবিষ্যৎ।
তরুণের এই নীরব ব্যাকুলতা আর দীর্ঘশ্বাসের কথা পৌঁছায় এক হিন্দু প্রতিবেশীর দরবারে। কোনো দ্বিধা কিংবা বিনিময় প্রত্যাশা ব্যতিরেকেই অকৃত্রিম মানবতাবোধের তাগিদে স্বপ্রণোদিত হয়ে তিনি বাড়িয়ে দেন নিজের হাত। তরুণের ভবিষ্যতের সামনে থেকে ভিটেমাটিহীনতার অনিশ্চয়তা দূর করতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দান করে দেন নিজের এক শতক জমি; যেন একখণ্ড মাটি নয়, এক তরুণের স্বপ্নকে তিনি ভালোবেসে উপহার দিলেন পরম নিশ্চিন্ততার আকাশ। কেবল জমি দান করেই ক্ষান্ত হননি, দলিলে মালিকানার আইনি সিলমোহর বসাতে রেজিস্ট্রেশনের যাবতীয় ব্যয়ভারও নিঃসংকোচে বহন করেছেন সেই উদার মহানুভব প্রতিবেশী।
রোববার (৪ অক্টোবর) সিলেটের মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার সাবরেজিস্ট্রার এই বিরল ও হৃদয়ে সুধা ঢালা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। সরকারি নিয়ম-রীতির নিগড়ে নাম দুটি হয়তো এখনো খাতার পাতায় গোপন, কিন্তু তাদের এই নিভৃত বদান্যতা আজ ছড়িয়ে পড়েছে লোকালয়ে।
ধর্মের বিভাজন নয়, নিখাদ ভালোবাসার এমন অনন্য দৃষ্টান্ত আজ মানুষের হৃদয়ে আশার আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অন্ধকারের বিপরীতে আলো জ্বালানো এই অবিস্মরণীয় ঘটনা প্রমাণ করে—কাগজে-কলমের পরিচয়ের চেয়েও বহু উঁচুতে আমাদের চিরায়ত সম্প্রীতি ও রক্তমাংসের মহৎ মানবিকতা।
নীরব চাকলাদার/ ডিডি/ প্রসি-২০২৬
মন্তব্য করুন: