তারবিহীন বিদ্যুৎ সঞ্চালনের প্রকল্প শেষ, বাস্তবে কতটা বদলাল সিলেট নগর?

তারবিহীন বিদ্যুৎ সঞ্চালনের প্রকল্প শেষ, বাস্তবে কতটা বদলাল সিলেট নগর?

দীপ্ত বৈষ্ণব

১১/১০/২০২৬ ১৫:২৬:২২

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

ঢাকা থেকে সপরিবারে সিলেটে বেড়াতে আসা ঈশিতা সরকার দরগাহ গেট এলাকায় দাঁড়িয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করে বলছিলেন, “এখানকার সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এখানে কোনো কারেন্টের লাইন নেই। বিষয়টি আমাদের দেশের জন্য খুবই নতুন ও চমৎকার।”

সিলেটের তারবিহীন বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার এই দৃশ্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মুগ্ধ করলেও, প্রশ্ন উঠেছে—এই পাইলট প্রকল্পের আওতায় আসলে কতটুকু কাজ হওয়ার কথা ছিল এবং বাস্তবে কতটুকু সম্পন্ন হয়েছে?

স্বপ্নের শুরু ও কাজের পরিধি

নগরীর বিদ্যুতের খুঁটি ও তারের জঞ্জাল কমিয়ে সৌন্দর্য বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০১৯ সালে শুরু হয়েছিল ভূগর্ভস্থ (আন্ডারগ্রাউন্ড) বিদ্যুৎ সঞ্চালনের পরীক্ষামূলক এই প্রকল্প। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পাওয়া ‘সিলেট বিভাগ বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে প্রায় সাত কিলোমিটার লাইন ভূগর্ভস্থ করার পরিকল্পনা ছিল।

দরগাহ গেট থেকে শুরু করে নয়াসড়ক, কুমারপাড়া, জিন্দাবাজার, কোর্ট পয়েন্ট, সার্কিট হাউসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এই ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছিল। দীর্ঘ সাত বছর পর চলতি বছরের জুনে প্রকল্পটির কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

তথ্য সংকটে ধোঁয়াশা

প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার দাবি করা হলেও বাস্তবে এর সুফল ও বিস্তৃতি নিয়ে রয়েছে নানা অস্পষ্টতা। দরগাহ গেট এলাকা ছাড়া নগরীর অন্যান্য প্রধান সড়কে এখনো বিদ্যুতের তার ও খুঁটির জঞ্জাল দৃশ্যমান। সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝার উপায় নেই কোথায় আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন রয়েছে আর কোথায় প্রচলিত ওভারহেড লাইন চলছে।

এ বিষয়ে পিডিবি ও সিলেট সিটি করপোরেশনের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও পাওয়া যায়নি কোনো সুনির্দিষ্ট বা পূর্ণাঙ্গ তথ্য। একে অপরকে দায় ঠেলে দেওয়ার সংস্কৃতিতে প্রকল্পের প্রকৃত চিত্র আড়ালেই থেকে গেছে।

পিডিবি কর্মকর্তাদের বক্তব্য

সহকারী প্রকৌশলী জারজিসু রহমান রনি থেকে শুরু করে সাবেক ও বর্তমান প্রকল্প পরিচালকদের বক্তব্যেও পাওয়া গেছে অসঙ্গতি। প্রকল্প পরিচালক চন্দন কুমার সূত্রধর জানিয়েছেন, পুরো শহরকে এ প্রকল্পের আওতায় আনার কথা ছিল না। এটি ব্যয়বহুল হওয়ায় পরিকল্পনা পর্যায়ে সীমিত রাখা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো প্রকল্পের ১ হাজার ৭২৩ কোটি টাকার মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। তবে আন্ডারগ্রাউন্ড কেবলের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট কত ছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো চিত্র মেলেনি।

সিটি করপোরেশনের বক্তব্য

সিসিকের বিদ্যুৎ প্রকৌশলী জয়দেব বিশ্বাস জানান, তৎকালীন মেয়র আরিফুল চৌধুরীর অনুরোধে পিডিবি এই কাজ করেছিল। তবে বর্তমান ও সাবেক প্রশাসকদের অনেকে প্রকল্পটি সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

নাগরিক প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নগরবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল পুরো সিলেট শহর তারবিহীন ও পরিচ্ছন্ন রূপ লাভ করবে। দরগাহ গেটের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রাসেল বা রেস্তোরাঁ পরিচালক মৃণাল কান্তি দাসের আক্ষেপ, পুরো শহর এই ব্যবস্থার আওতায় এলে নগরীর সৌন্দর্য বহুগুণ বেড়ে যেত।

পর্যটকদের চোখে যে উদ্যোগ সিলেটকে আধুনিক করে তোলার সম্ভাবনা জাগায়, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও স্বচ্ছতার অভাব স্পষ্ট। সাত বছর পর প্রকল্পের সমাপ্তি ঘটলেও নগরবাসীর মনে প্রশ্ন থেকেই গেছে—তারবিহীন বিদ্যুতের এই আলো আসলে ঠিক কত দূর পৌঁছাল?

নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad