নিখোঁজ ছেলের শোক নিয়েই চলে গেলেন চিত্রনায়িকা নাসিমা
চিত্রনায়িকা নাসিমা খানের জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছে নিখোঁজ ছোট ছেলের অপেক্ষায়। সন্তানকে খুঁজে পেতে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেছেন, গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেছেন নিজের অসহায়ত্ব, পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রকাশ করেছেন অসন্তোষ।
কিন্তু ছেলের কোনো সন্ধান পাওয়ার আগেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন ষাটের দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা নাসিমা খান।
রোববার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এই অভিনেত্রী। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলো নিখোঁজ সন্তানকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা।
চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি আশুলিয়ার পাথালিয়া ইউনিয়নের নিরিবিলি স্বপ্ন বিলাশ থেকে নিখোঁজ হন নাসিমা খানের ছোট ছেলে নাবিল নাছির রহমান কুশল।
এরপর থেকেই ছেলের সন্ধানে বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে যান অভিনেত্রী। একাধিকবার গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলে তুলে ধরেন সন্তানকে হারিয়ে তার উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার কথা।
ছেলের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত এক ভিডিওতে নাসিমা জানিয়েছিলেন, কুশল সাধারণত বাড়িতেই থাকতেন। বাইরে যাওয়া নিয়েও তার কিছু বিধিনিষেধ ছিল। তবে ঘটনার দিন ছেলেকে কিছুক্ষণের জন্য বাইরে ঘুরে আসার অনুমতি দিয়েছিলেন তিনি।
নাসিমার বর্ণনা অনুযায়ী, সেদিন ঘরে থাকতে থাকতে ক্লান্ত লাগার কথা মাকে জানিয়েছিলেন কুশল। একটু নিচে ঘুরে আসতে চেয়েছিলেন তিনি।
এ সময় চা খাওয়ার জন্য মায়ের কাছে ৫০ টাকাও চান। ছেলের আবদারে সেই টাকা দিয়েছিলেন নাসিমা। কিন্তু এরপরই নিখোঁজ হয়ে যাবেন কুশল, তা ভাবতেও পারেননি তিনি।ছেলেকে খুঁজে পেতে প্রথমে পরিচিতজন ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যোগাযোগ করেন নাসিমা। কিন্তু কোথাও কুশলের সন্ধান মেলেনি।
অভিনেত্রী জানিয়েছিলেন, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় নিজের দুটি মোবাইল ফোনই রেখে গিয়েছিলেন তার ছেলে। ফলে ফোনেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরে আশুলিয়া থানায় গিয়ে নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি।
তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও ছেলের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন নাসিমা। পুলিশের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার অভিযোগ ছিল, ছেলের খোঁজে পুলিশের কাছে জানতে চেয়েও সন্তোষজনক উত্তর পাননি। একপর্যায়ে হতাশা নিয়ে থানা থেকে ফিরে আসেন।
সন্তান কোথায় আছে, কেমন আছে, এমনকি বেঁচে আছে কি না- এসব প্রশ্নের উত্তরও জানা ছিল না অভিনেত্রীর। ছেলের নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তার পরিণতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটিয়েছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সেই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটার আগেই থেমে গেল তার জীবন।
নাসিমা খানের দেখাশোনা করতেন নুরজাহান বেগম। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বেশ কিছুদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন অভিনেত্রী।সাত দিন আগে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শুরুর দিকের অভিনেত্রীদের মধ্যে অন্যতম নাসিমা খান। ১৯৫৯ সালে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তার।
পরে ১৯৬১ সালে ‘যে নদী মরু পথে’ সিনেমায় নায়িকা হিসেবে অভিনয় করে পরিচিতি পান তিনি। ষাটের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় করেছেন এই অভিনেত্রী। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১১ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ‘কুসুম কুসুম প্রেম’ সিনেমায় তাকে সর্বশেষ দেখা যায়।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে দর্শকের ভালোবাসা পাওয়া নাসিমা খানের জীবনের শেষ অধ্যায়টি কাটে এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে। নিখোঁজ ছেলেকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা আর পূরণ হলো না তার।কুশলের সন্ধান না মেলার বেদনা নিয়েই বিদায় নিতে হলো একসময়ের জনপ্রিয় এই চিত্রনায়িকাকে।
পূজা বাড়াইক/প্রসি-২৬
মন্তব্য করুন: