শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমী আজ,মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের ভিড়
আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমী। ষষ্ঠীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সারা দেশের পূজামণ্ডপে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে পূজার্চনা। ঢাকের বাদ্য, কাঁসরের ধ্বনি, শঙ্খনাদ ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছে মণ্ডপগুলো। সকাল থেকেই দেবী দর্শন ও পূজার্চনায় অংশ নিতে ভক্তদের সমাগম ঘটছে।
মহাসপ্তমী দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন ভক্তরা দেবী দুর্গার কাছে শান্তি, সমৃদ্ধি, শক্তি ও বিশ্বকল্যাণ কামনা করেন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় দিনটি পালন করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
মহাসপ্তমীর অন্যতম প্রধান আচার নবপত্রিকা স্থাপন, যা সাধারণভাবে ‘কলাবউ’ নামে পরিচিত। কলাগাছের সঙ্গে কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ একত্রে বেঁধে স্নান করানোর পর নতুন শাড়ি পরিয়ে মণ্ডপে স্থাপন করা হয়। এসব উদ্ভিদকে দেবীর বিভিন্ন শক্তির প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়।
নবপত্রিকা পূজার মধ্য দিয়ে প্রকৃতি ও মানুষের নিবিড় সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। খাদ্য, চিকিৎসা ও কৃষিসহ মানুষের জীবনধারণে উদ্ভিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি গাছপালা সংরক্ষণ, জলাশয় রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টিও এ আয়োজনের সঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণভাবে যুক্ত।
মহাসপ্তমীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আচার হলো দেবীর মহাস্নান। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, দর্পণে দেবীমূর্তির প্রতিফলন ঘটিয়ে বিভিন্ন পবিত্র উপাচারে এই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। ভক্তদের কাছে এটি শুদ্ধতা ও পবিত্রতার প্রতীক।
হিন্দু পুরাণে দেবী দুর্গার সঙ্গে মহিষাসুরের যুদ্ধ অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। দেবীর দশ হাতের অস্ত্র অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার শক্তিকে নির্দেশ করে। দেবীর সঙ্গে পূজিত লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ সমৃদ্ধি, জ্ঞান, বীরত্ব ও প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
দুর্গোৎসব ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা ও ঢাকের বাদ্যকে ঘিরে প্রতিমাশিল্পী, মৃৎশিল্পী, ঢাকি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কর্মচাঞ্চল্য বাড়ে। উৎসবটি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ ও সম্প্রীতির বন্ধনও দৃঢ় করে।
বাংলাদেশে মহাসপ্তমীর এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের গুরুত্ব নতুন করে সামনে আসে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং সবাই যেন নির্ভয়ে নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারেন, সেটিই উৎসবের অন্যতম প্রত্যাশা।
মহাসপ্তমীর আনন্দ ও পূজার্চনার মধ্য দিয়ে ভক্তদের প্রত্যাশা, অশুভের বিনাশ, শুভবোধের জাগরণ এবং সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: