কাইক্কা মাছের ঝাল-ঝোল
Led Bottom Ad

বাবা দিবসে

কাইক্কা মাছের ঝাল-ঝোল

১৫/০৬/২০২৫ ০৯:০৭:১০

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

কাইক্কা মাছের ভুনা বা ঝোল আব্বার খুব পছন্দের ছিলো। কিন্তু এ মাছ খেতে গেলেই অতি অবশ্যই তিনি গলায় কাঁটা বিঁধিয়ে যা একটা কাণ্ড করতেন! তারপর পুরানো পাণ্ডুলিপির নতুন এপিসোড যুক্ত হতো। এখনও আমার, আম্মার (আনোয়ারা তরফদার)রান্না এ মাছের ঝাল-ঝোলের চেহারা একদম মনে আছে। একটু লালচে, যেনো একটা টমেটো কেটে দেয়া হয়েছে তার উপর সুগন্ধী ধনে পাতার ফাঁকে কমলার খোসা ভাসছে। মাছের পাশে পাশে তেলের গোল্ডেন লাইনিং। চামুচে করে গরম ভাতের উপর নিলেই ঘানি ভাঙানো সর্ষের তেলের মিষ্টি কিন্তু ঝাঁজালো গন্ধটা নাকে আসতো। 


আম্মার তা রাঁধতে সময় লাগতোনা মোটেই। বড় জোর দশ মিনিট! বরং কাইক্কা বেশি রান্না করলে কাইক্কার মাছাংশ মাঝের কাঁটা থেকে বাজুবন্দের মত খুলে খুলে যায়।তাই খড়ির চুলোর গনগনে আগুনে কড়াই বসিয়েই সঙ্গে সঙ্গে সর্ষের তেল দিয়েই তিনটের মত কাঁচা লংকা ফেলে দিতে না দিতে তেল থেকে পটকা ফাটার শব্দ হলেই আম্মা সব নিয়ে একদম রেডি। উপকরণ ও পরিমাণ ঠিক করা সব তার হাতের কাছে থাকতো। আর আম্মার পেছনে দাঁড়ানো থাকতাম ছোট্ট আমি। বয়স দশ বা এগারো। আম্মার রান্নার কার্যকলাপ আমার খুব ভাল লাগতো। আমি তাঁর করতাম তাঁর মাছ ও সবজি কোটা-বাছা সবই চোখ গোল গোল করে গিলতাম। মাঝে মাঝে আম্মাকে এটা সেটা এনে দিতাম। 


প্রথমেই পুরানো খবরের কাগজ বিছিয়ে ব্যতীতে কাইক্কার সূঁচো মুখ ভোঁতা করে বটি দিয়ে ছোট ছোট দেড় বা দু’ইঞ্চি মাপের মত করে কেটে এ্যালুমিনিয়ামের বউলে নিয়ে চিনে মাটির খয়েরী বয়াম থেকে একমুঠ লবন ফেলে মাছের আঁশটে ভাব ছাড়াবার জন্য হাতে মাখতে থাকতেন। তারপর কুয়োর জল দিয়ে ধুয়ে নিতেন। খোঁপ খোঁপ করা কালচে রঙ কাঠের গোল ভারি ও স্যাঁতস্যাঁতে বাটা-মশলার প্লেট, তামার ছেনি, লোহার কালো ভারি কড়াই. কশানোর পর দেবার জন্য কাঁসার জগভরা জল,কাটা ধনে পাতা, বাটিতে ভেজানো দু’তিন টুকরো কমলার খোসা সব নিয়ে বসতেন।কমলার খোসা, পেঁয়াজ, ধনে, হলুদ আর বাটা মরিচ ঐ কড়াইর পট পটানো তেলে ঘুঁটে কশিয়ে একটু জল দিতেন। ব্যাস অল কোয়াইট এন দ্যা কিচেন ফ্রন্ট।  এবার ৩০ সেকেন্ড পর চুলোর পাশে কাটের পিঁড়িতে বসা এক প্যাঁচ সূতি শাড়ি পড়া আমাদের মা চকচকে কাঁসার জগ থেকে অল্প জল দিয়ে  সাঁতলে কড়াই ঢেকে দিতেই কষা মশলার ঘ্রাণ দিয়ে আমাদের খিদের নিচে দেশলাই জ্বালিয়ে দিতেন। আমরা ফিনিশড! মাঝের ঘর থেকে সে সুগন্ধ পাওয়া যেতো। আর আব্বা গেঞ্জি পরে পায়চারি করতেন। কিন্তু শান্তি করে খাবার কি উপায় আছে? আব্বা যে অবধারিত ভাবে কাঁটা লাগিয়ে খাবার ঘরকে একটা সার্জারি বানিয়ে ফেলতেন!


সে গল্পই বলছি। কাইক্কার ঝোল খেতে বসলেই হতো; দেখতাম আব্বা দু’লোকমা খেয়েই আম্মার দিকে বেফানার মত হয়ে চেয়ে আছেন। সঙ্গে সঙ্গে বুঝতাম। কাজ শেষ। মানে গলায় কাঁটা বিঁধে গেছে এই তো!আমরা চার ভাইবোন সেদিকে তাকিয়ে খাওয়া বন্ধ করবো কি করবো না ভাবতাম। এ হোল প্রথম পর্ব। দ্বিতীয় পর্বে সেকেন্ড পার্টি যুক্ত হতেন। এই পর্বে আম্মা সংগে সংগে নিজের পাতে এক হাতা সাদা ভাত নিয়ে দ্রুত দোয়া পড়ে পড়ে ভাতের পিণ্ড বানিয়ে ফুঁ দিয়ে দিয়ে আব্বার হাতে দিয়ে বলছেন, ভাত না চাবাইয়া গিলুক্কা – গিলুক্কা ... বলতেন। আব্বা চোখ মুখ লাল করে গেলার চেষ্টা করতেন।কাইক্কার কাঁটা না! কোন কাজ হতো না। আম্মা ভাতের গোল্লা পাকাচ্ছেন আর দিতেন।আমরা ‘ ঘটনা’ কি হয় দেখতে খাওয়া রেখে উঠে দাঁড়াতাম। বুঝে যেতাম এক্ষুনি এস ও এস লাগবে। তৃতীয় পর্বে ভাইয়া দৌড়ে উঠে উপরের সিলিং ফ্যানের স্পিড বাড়াতো, আমি বন্দুকের গুলির মত ছুটে গিয়ে শোবার ঘরের কাঠের ’ফেনীর আলমারীর’ উপর থেকে লম্বা  ‘মুচনা’ নিয়ে আসতাম।মুচনা বা চিমটা বা টুইজার যাই হোক এনে সেটা আনলে বুজান নিয়ে আসতো আয়না।আব্বা খাবার প্লেট ঠেলে হাতে আয়না নিয়ে মুখগহব্বর যত বড় করতে হা  হা করছেন। আর চশমা চোখে আম্মা  সেই হা’র ভেতরে কাইক্কার সাদা কাঁটা খোঁজার চেষ্টা করছেন। দেখতে পাচ্ছেন না। 


এরপর যুগলে – একজন হা করে আয়না হাতে, অন্যজন চিমটা হাতে ঘরের ভেতরের রোদ  লক্ষ্য করে সবুজ জানালার কাছে যাবেন। আমরা কেউ একজন আবার ফেনীর আলমারী উপর মারফি রেডিওর পেছন থেকে রূপালী তিন ব্যাটারি এভাররেডী টর্চ লাইট আনবো। অপারেশন টিম রেডি।শেষ পর্বে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি ও লুংগি পরা আব্বা উঁচু কাঠের টুলে বসে মুখের সামনে আয়না ধরে রাখতেন। ভাইয়া  আব্বার নির্দেশানুযায়ী তাঁর হা লক্ষ্য করে আলোক পাত করতো। আম্মা সে অস্বাভাবিক লম্বা সেই মুচনা দিয়ে টুক করে কাঁটাটা তুলে আনতেন (মুচনাটা জামাল পুরের ষ্টেশন রোডের কামারকে দিয়ে বিশেষ ভাবে বানানো বলে তার দৈর্ঘ্য ছিলো বকের ঠোঁটের মত দীর্ঘ। আব্বার বদলীর চাকুরীতে এই চিমটা আমাদের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরতো। যেখানেই কাইক্কা সেখানেই সেটার ভূমিকা অত্যাবশ্যকীয় ছিলো। 


দেখতে চোখা, রক্তহীন গা কাইক্কা মাছের ঐ বক মার্কা সূঁচালো ঠোঁট হলেও কিন্তু তার দেহের মাছে কিন্তু অত কাঁটা নেই। মাছ দেখতে সাদা ও সুন্দর। ফিনফিনে লেজ থেকে গলা অবধি ধূসর এক দাগ। গা’ একেবারে জিরো ফিগার গা। আগাগোড়া ঐ সরু দেহের উপরে চ্যাপ্টা মাথা থেকে বেরিয়েছে সূঁচালো চঞ্চু। মেরুদন্ডের বড় কাঁটা ছাড়া বাকি পেটের কাঁটা। তা আবার বেশ নরম- খেতে গিয়ে দেখেছি। আব্বার কন্ঠনালি নিশ্চয়ই নরোম না হলে রুই, ইলিশের কাঁটাতো না। এগুলো লাগে কি করে! আম্মা মাঝে মাঝে রাগ করে বলতেন, ‘ কাইক্কা না খাইলে কিতা অয়!- আনোয়ারা,  তোমার কমলার চুকলা দিয়া রান্দা খাইক্কা বুনা যে মজার গো, বলতেন আব্বা।


এর পর আমরা সিলেট থেকে আনা গোলাপী বিরুইন চালের আঠা ভাতের সঙ্গে কলা বা আম দিয়ে মাখার জন্য বুজান তারের জালির মিট সেফ থেকে পুরো সর পড়া দুধের খাড়া হাড়িটি নিয়ে আসতেন। কিন্তু সে পর্বের আগের ড্রামা মনে করে এখনো হাসি। কি উপায় আছে। আব্বা যে কাঁটা লাগিয়ে খাবার ঘরকে একটা সার্জারি বানিয়ে ফেলতেন!


বাবা দিবসে এ মজার কাহিনীটি আবার পোস্ট করলাম। গত ক’দিন ধরে আব্বার এ ছবিটা দেখছি।কী স্মার্ট, কী স্টাইলিস্ট! আব্বা আমার চেয়ে কম ঢের বয়সে চলে গেছেন।৫৯ একটা যাবার বয়স হলো? একদম না।ফুফুরা বলতেন আমার নাকি বাবার মত চেহারা! আমারও মনেহয় চুল গয়না বাদ দিলে আব্বারই মত দেখায় । আপনি কি বলেন? তবে আমি যা যা করেছি এই সত্তোর উর্ধ বয়স অবধি তার সবই বাবার মতই। কোন কোন ঘটনা একদম সমিল । 

আব্বা গো মায়া দিলাম। 

লেখক

কবি ও প্রাবন্ধিক

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad