হবিগঞ্জে কৃষিজমির টপ সয়েল লুট: প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে সক্রিয় মাটিখেকো চক্র
কৃষিজমি শুধু খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়—এটি পরিবেশের ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। অথচ হবিগঞ্জ জেলায় প্রতিবছর শীত মৌসুম এলেই সংঘবদ্ধ মাটিখেকো চক্র কৃষিজমির উর্বর টপ সয়েল কেটে নির্বিচারে বিক্রি করছে। অভিযোগ রয়েছে, জেলার শায়েস্তাগঞ্জ, বাহুবল, নবীগঞ্জ ও চুনারুঘাট উপজেলায় প্রতিদিনই এই অবৈধ কার্যক্রম চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব উপজেলায় বিস্তীর্ণ কৃষিজমি থেকে এক্সক্যাভেটর দিয়ে টপ সয়েল কেটে ট্রাক ও ট্রাক্টরের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় পরিবহন করা হচ্ছে। নামমাত্র দামে কৃষকদের কাছ থেকে মাটি কিনে তা ইটভাটা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত স্থাপনায় কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
ফসলি জমিতে ভারী যন্ত্রপাতির অবাধ ব্যবহারে জমির স্বাভাবিক গঠন ও উর্বরতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, টপ সয়েল তুলে নেওয়ার পর ওই জমিতে আগের মতো ফলন পাওয়া যাচ্ছে না। এতে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
অভিযোগ উঠেছে, মাটি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ মধ্যস্বত্বভোগী চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের একটি অংশকে প্রভাবিত করে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মাটিখেকোরা সহজেই লাভবান হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার ব্রাহ্মণডোরা ইউনিয়নের শেরপুর, কেশবপুর ও ঋষিপাড়া এলাকা থেকে নিয়মিতভাবে কৃষিজমির মাটি কাটা হচ্ছে। এসব এলাকায় কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি ট্রাক্টর টপ সয়েল মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় কিনে ইটভাটাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এক হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
ব্রাহ্মণডোরা এলাকার বাসিন্দা শিপন মিয়া বলেন,“প্রতিদিনই আমাদের এলাকার জমি থেকে মাটি তুলে ট্রাক্টরে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে বলা হয়, টাকা দিয়েই মাটি কেনা হয়েছে।”
বাহুবল উপজেলার জয়নাবাদ গ্রামের রাজু মিয়া জানান,“আমাদের এলাকায় প্রতিদিন ৮ থেকে ১০টি ট্রাক ও ট্রাক্টর মাটি পরিবহন করে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় এই কাজ হওয়ায় কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।”
পরিবেশ সচেতন মহলের মতে, হবিগঞ্জ জেলার নদী, হাওর ও কৃষিভিত্তিক পরিবেশ ইতোমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ মোকাবিলা করছে। কৃষিজমির টপ সয়েল কাটা হলে মাটির পানি ধারণক্ষমতা কমে যাবে। এতে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা, ভূমিধস ও ফসলহানির ঝুঁকি বাড়বে।
হবিগঞ্জ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, “কৃষিজমি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। অপরিকল্পিতভাবে মাটি কাটা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং খাদ্য উৎপাদনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। এক্সক্যাভেটর দিয়ে কৃষিজমির মাটি তোলা বন্ধে প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে।”
বাহুবল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুল ইসলাম বলেন, “মাটি খেকোদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে জরিমানা করা হয়েছে।”
নবীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রত্যয় হাশেম জানান, “অপরিকল্পিতভাবে মাটি কাটা বন্ধে প্রশাসন কঠোর রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাহিদ হোসেন বলেন, “প্রাপ্ত অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
এ রহমান
মন্তব্য করুন: