শাহবাজপুর-থানাবাজার সড়ক : প্রতিদিন ঝুঁকিতে চলছে যানবাহন
Led Bottom Ad

শাহবাজপুর-থানাবাজার সড়ক : প্রতিদিন ঝুঁকিতে চলছে যানবাহন

নিজস্ব প্রতিনিধি, বড়লেখা

২৯/০৫/২০২৫ ১২:১২:২৪

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার শাহবাজপুর-থানাবাজার সড়কের অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে, মনে হয় এ পথ দিয়ে চলতে চলতে আমরা ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছি। প্রতিটি গর্ত যেন একেকটা ফাঁদ জীবন কেড়ে নেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে।’ কথাগুলো বলছিলেন গাড়ি চালক কবির আহমদ। গলার স্বর ভারি, চোখে অশ্রু। কিছু দিন আগেই একটি ঘটনা তার জীবনের ভেতরটা যেন তছনছ করে দিয়েছে।

তিনি জানান, ‘একজন সন্তানসম্ভবা নারীকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলাম। রাস্তা এত ভাঙা যে, গাড়ি যেন গর্তে পড়ে আছড়ে পড়ছিল একেকবার। হঠাৎ একটা বড় গর্তে পড়ে এমন ঝাঁকুনি খায় যে গাড়ির ভেতর চিৎকার করে উঠলেন তিনি। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ডাক্তার জানালেন, গর্ভেই সন্তানটি মারা গেছে। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। চোখের সামনে একটা নিষ্পাপ প্রাণ এভাবে চলে যাবে, ভাবতেই পারিনি।’

এটি একটি গল্প নয় প্রতিদিন এই সড়কে ঘটছে এমন মর্মান্তিক ঘটনা। গর্তে পড়ে মানুষ আহত হচ্ছে, মোটরসাইকেল উল্টে গুরুতর আহত হচ্ছে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা, সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পেরে জীবন হারাচ্ছে রোগীরা। সড়কটি যেন আর সড়ক নেই , একটা মৃত্যুকূপ।

মৌলভাবাজারের বড়লেখা উপজেলার শাহবাজপুর-দৌলতপুর-থানাবাজার সড়কে যানবাহন চালানোর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা দিচ্ছিলেন কার চালক কবির আহমদ। শুধু কবিরই নন, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে চালক ও যাত্রীরা এরকমন নানা ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন। 

স্থানীয় বাসিন্দা ও যানবাহন চালকদের অভিযোগ, এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন ৩টি ইউনিয়নের শত শত মানুষ চলাচল করেন। তবে সড়কটির করুণ অবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে কোনো লাভ হচ্ছে না। স্থানীয়রা দ্রুত সড়কটি মেরামতের দাবি জানিয়েছেন। 

সরেজমিন দেখা গেছে, শাহবাজপুর থেকে থানাবাজার পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার পুরো সড়কজুড়েই ছোট-বড় গর্ত। ভারী যানবাহনের চাপে সড়কের অনেক অংশ দেবে গেছে। আবার কোথাও পিচ উঠে গেছে। সড়কের বিভিন্ন গর্তের বৃষ্টির পানি জমে গর্তগুলো আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

অটোরিকশা চালক আবু সাঈদ ও আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, এই সড়ক দিয়ে তারা গাড়ি চালাতে গিয়ে নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন। যেখানে আগে সড়ক পার হতে বিশ মিনিট সময় লাগত, এখন প্রায় ঘন্টাখানেক সময় লাগছে।  প্রায় দুর্ঘটনা ঘটছে। আমাদের বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে।

একজন বৃদ্ধ যাত্রী বলেন, ‘এই রাস্তায় চলতে গেলে মনে হয়, বেঁচে ফিরতে পারব কি না, সেটাই সন্দেহ।’ আরেকজন গর্ভবতী নারী কান্নাভেজা কণ্ঠে বলছিলেন, ‘আমার ভয় হয়, আমি সন্তানকে পৃথিবীর মুখ দেখাতে পারব তো?’

শিক্ষার্থী ছাইদুল ইসলাম বলেন, এই সড়কটি শুধু একটি যোগাযোগের পথ নয়, এটি এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, ব্যবসা ও জরুরি সেবার স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় এটি জনদুর্ভোগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এতদিন অপেক্ষার পর আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়েছে। আমি সংশ্লিষ্টদের দ্রুত সড়কটি সংস্কারের দাবি জানাই।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) বড়লেখা উপজেলা শাখার সভাপতি তাহমীদ ইশাদ রিপন বলেন, ‘শাহবাজপুর-থানাবাজার সড়কের অবস্থা অত্যন্ত বেহাল। প্রতিদিন শত শত যানবাহন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করে। কিন্তু সড়কের নাজুক অবস্থার কারণে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনা ঘটছে। এ নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিতে আমরা ইতোমধ্যে মৌলভীবাজার সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি, যাতে দ্রুত এই সড়কের সংস্কারকাজ শুরু করা হয়।’

উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি কাওছার হামিদ ছুন্নাহ বলেন, সড়কের বেহাল দশায় মানুষ অতিষ্ঠ। শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, যানচালক, ব্যবসায়ী-সবাই আজ ঐক্যবদ্ধ। আর কোনো অজুহাত আমরা মানব না। অবিলম্বে সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু করতে হবে। তা না হলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যাব।

মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির নেতা মুজিব রাজা চৌধুরী বলেন, সড়কটি সংস্কারের জন্য আমরা বিভিন্ন জায়গায় ধর্ণা দিয়েছি। আমাদের কেউ বলেছেন, টেন্ডার হয়েছে। কেউ বলেছেন, প্রক্রিয়াধীন। গত কয়েকদিন আগে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে বলেছিলাম, তিনি বলেছেন টেন্ডার হয়ে গেছে। এসময় তিনি প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, টেন্ডার হয়ে গেলে কাজ কোথায়। তিনি বলেন, আমরা টেন্ডার প্রক্রিয়া এসব বুঝি না। আমরা চাই দৃশ্যমান কাজ। আমরা ইতিমধ্যে মানববন্ধন করেছি। সড়কের কাজ দ্রুত না হলে আমরা এর শেষ দেখে ছাড়ব।

এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কায়সার হামিদ বলেন, সড়কটি সংস্কারের জন্য প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। এখন অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। অনুমোদন পেলেই এক থেকে দুই মাসের মধ্যে সংস্কার কাজ শুরু হবে।

মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad