টাঙ্গুয়ার হাওরে অস্তিত্ব সংকটে দেশি মাছ ও পাখি: দুই দশকে বিলুপ্ত প্রায় অর্ধেক প্রজাতি
‘নয় কুড়ি কান্দা আর ছয় কুড়ি বিলের’ সংমিশ্রণে গঠিত দেশের দ্বিতীয় বিশ্ব ঐতিহ্য টাঙ্গুয়ার হাওর এখন চরম জীববৈচিত্র্য সংকটে। গত দুই দশকের ব্যবধানে এই হাওর থেকে প্রায় অর্ধেক প্রজাতির দেশি মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে মাঠ পর্যায়ের গবেষণায় উঠে এসেছে। অবৈধ জাল, বিষ প্রয়োগ, ইলেকট্রিক শক এবং অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের ফলে দূষণে বিপন্ন হয়ে পড়েছে এই রামসার সাইটের বাস্তুসংস্থান। এর প্রভাবে কেবল মাছই নয়, গত ১০ বছরে পরিযায়ী ও দেশি পাখির বিচরণ কমেছে প্রায় ৭৭ শতাংশ।
মাছের প্রজাতির আশঙ্কাজনক হ্রাস
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক মৃত্যুঞ্জয় কুণ্ডুর গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৭ সালে আইইউসিএন টাঙ্গুয়ার হাওরে ১৪১ প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব পেয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে মাত্র ৭৬ প্রজাতির মাছ অবশিষ্ট আছে। যার মধ্যে নিয়মিত দেখা মেলে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ প্রজাতির। বিলুপ্তপ্রায় মাছের তালিকায় রয়েছে এক সময়ের পরিচিত চিতল, নানীদ, বাঘআইড়, কাকিলা ও মহাশোলের মতো প্রজাতি। বর্তমানে হাওরপাড়ের মানুষ বিলের দেশি মাছের বদলে বাজার থেকে কেনা চাষের পাঙ্গাস ও তেলাপিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
পাখি ও বন্যপ্রাণীর বিচরণে ধস
২০২৪ সালের পাখি শুমারির তথ্যমতে, টাঙ্গুয়ার হাওরে বর্তমানে মাত্র ৪৯ প্রজাতির ৪৩ হাজার ৫১৬টি পাখি বিচরণ করছে। বন্যপ্রাণী গবেষক সীমান্ত দীপুর মতে, ২০ বছরের মধ্যে এ বছরই সবচেয়ে কম পরিযায়ী পাখি এসেছে। হাওরে বিষটোপ দিয়ে পাখি শিকার, রাতে ইঞ্জিনচালিত নৌকার শব্দ, অবাধে গরু-মহিষ চড়ানো এবং হিজল-করচ বন উজাড় হওয়ার কারণে পাখিরা তাদের নিরাপদ আবাসস্থল হারাচ্ছে।
সংকটের মূল কারণসমূহ
গবেষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, টাঙ্গুয়ার হাওরের এই বিপর্যয়ের পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ দায়ী:
* অবৈধ সরঞ্জামের ব্যবহার: নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ জাল, ‘কিরণমালা চাঁই’ এবং ইলেকট্রিক শক দিয়ে নির্বিচারে মাছ শিকার।
* দূষণ: পর্যটনবাহী হাউজবোটের বর্জ্য এবং ভারত থেকে আসা কয়লাবাহী নৌযানের কারণে পানি বিষাক্ত হয়ে পড়া।
* আবাসস্থল ধ্বংস: বিলের পানি শুকিয়ে বোরো চাষ, জলারবন (হিজল-করচ) কেটে ফেলা এবং পলি পড়ে বিল ভরাট হয়ে যাওয়া।
* বাণিজ্যিক হাঁসের খামার: হাওরজুড়ে বিপুল সংখ্যক পাতিহাঁস চরালে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য (প্লাঙ্কটন) ও ছোট পোনা সংকটে পড়ে।
উত্তরণের উপায় ও সরকারি উদ্যোগ
মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, টাঙ্গুয়ার হাওরকে বাঁচাতে হলে পাঁচটি মূল বিলকে ‘স্থায়ী অভয়ারণ্য’ ঘোষণা করা জরুরি। পাশাপাশি হাওরের সংযোগ নদীগুলো ড্রেজিং করা এবং কয়লা পরিবহন ও হাউজবোট চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য যে, টাঙ্গুয়ার হাওরের টেকসই ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে সম্প্রতি ৫০ কোটি টাকার একটি নতুন প্রকল্প শুরু করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর ও ইউএনডিপি। ৫ বছর মেয়াদী এই প্রকল্পের মাধ্যমে ১৫০০ হেক্টরের বেশি জলজ বাসস্থান পুনরুদ্ধার ও জীব-বৈচিত্র্য অভয়ারণ্য স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের পাশাপাশি বর্তমানের অবৈধ মৎস্য শিকার ও শিকারীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে প্রশাসনের সার্বক্ষণিক ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: