ডিএনএতে প্রমাণ, তবু স্বীকৃতি নেই
নবীগঞ্জে সন্তান কোলে নিয়ে এক মায়ের দীর্ঘ অপেক্ষা
তিন বছরের শিশু হালিমা মুর্শেদাকে কোলে নিয়ে পথ চলেন স্বপ্না বেগম। ছোট্ট শিশুটির চোখে প্রশ্ন—তার পরিচয় কী? আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন এক অসহায় মা।
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার কামারগাঁও গ্রামের এই ঘটনা এখন এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। আদালতের নির্দেশে করা ডিএনএ পরীক্ষায় শিশুটির জৈবিক পিতা হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হলেও, এখনো সেই স্বীকৃতি মেলেনি। উল্টো অভিযোগ, মামলা তুলে নিতে হুমকির মুখে পড়েছেন ভুক্তভোগী মা।
স্বপ্না বেগম জানান, জীবিকার তাগিদে তিনি কাজ নেন স্থানীয় এক প্রভাবশালী পরিবারের বাড়িতে। সেখানেই বিয়ের আশ্বাসে তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়। একসময় সেই সম্পর্ক জোরপূর্বক নির্যাতনে রূপ নেয়। পরে জন্ম নেয় কন্যাশিশু—হালিমা।
স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ হলেও কোনো সমাধান হয়নি। বরং পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে নিজের ও সন্তানের অধিকার আদায়ে আদালতের দ্বারস্থ হন স্বপ্না। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দায়ের করা মামলার তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন।
তদন্ত শেষে সংস্থাটি আদালতে যে প্রতিবেদন জমা দেয়, তাতে অভিযোগের সত্যতা উঠে আসে। আদালতের অনুমতিতে করা ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত করা হয়—শিশুটির জৈবিক পিতা অভিযুক্ত ব্যক্তি।
তবুও থামেনি অস্বীকার। স্বপ্নার অভিযোগ, প্রমাণ সামনে আসার পরও পিতৃত্ব স্বীকার না করে উল্টো তাকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি নিরাপত্তাহীনতায় এলাকা ছেড়ে থাকতে হচ্ছে তাকে।
এই ঘটনার আরেকটি বেদনাদায়ক দিক—সমাজের চোখে ‘পিতৃহীন’ পরিচয়ের বোঝা নিয়ে বড় হচ্ছে ছোট্ট হালিমা। অথচ আইনি প্রক্রিয়ায় তার পরিচয় স্পষ্ট।
তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘ এক বছর তদন্ত শেষে প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী পদক্ষেপ।
স্বপ্না বেগমের কণ্ঠে ক্লান্তি থাকলেও ভেঙে পড়ার সুর নেই। তিনি বলেন, “আমি শুধু আমার মেয়ের পরিচয় চাই। ও যেন মাথা উঁচু করে বলতে পারে—তার বাবা কে।”
একটি ডিএনএ রিপোর্ট হয়তো বৈজ্ঞানিক সত্য তুলে ধরে, কিন্তু সেই সত্যকে সামাজিক ও আইনি স্বীকৃতি পেতে যে লড়াই—তা এখনো শেষ হয়নি। মা ও মেয়ের সেই অপেক্ষা যেন আরও দীর্ঘ না হয়—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: