সিলেটে ২০ বছরে উজাড় হয়েছে ৮.৭ হাজার হেক্টর বনভূমি
সিলেট অঞ্চলের এক সময়ের আকাশছোঁয়া সবুজ টিলা ও ঘন অরণ্য এখন দ্রুত ঢেকে যাচ্ছে কংক্রিটের চাদরে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও পাহাড় কাটার ফলে গত দুই দশকে এই অঞ্চলের পরিবেশগত মানচিত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা ও উপগ্রহ উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সিলেট বিভাগ তার বৃক্ষ আচ্ছাদনের এক বিশাল অংশ হারিয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় তাপমাত্রা ও জলবায়ুর ওপর।
গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ-এর স্যাটেলাইটভিত্তিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সিলেট অঞ্চলে প্রায় ৮.৭ হাজার হেক্টর বৃক্ষ আচ্ছাদন (ট্রি কভার) বিলীন হয়েছে। এটি ২০০০ সালের মোট বনভূমির প্রায় ৭ শতাংশ। এই বন উজাড়ের ফলে পরিবেশে প্রায় ৪.৩ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বনভূমি ক্ষতির ৫৯ শতাংশই ঘটেছে মৌলভীবাজার জেলায়, যা একক জেলা হিসেবে সর্বোচ্চ (৫.১ হাজার হেক্টর)। এরপরই রয়েছে হবিগঞ্জ (২.৬ হাজার হেক্টর), সিলেট (৭৪০ হেক্টর) এবং সুনামগঞ্জ (২৩০ হেক্টর)।
সরেজমিনে সিলেট নগরের খাদিমনগর, টিলাগড় ও এয়ারপোর্ট রোড এলাকায় দেখা যায়, আগের সেই ঘন সবুজ বনানীর পরিবর্তে এখন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে অসংখ্য বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন। নগরের চৌখিদেখি এলাকার বাসিন্দা ইব্রাহিম আহমদ আক্ষেপ করে বলেন, “আগে চারদিকে গাছপালা ছিল, এখন শুধু ধুলা আর অসহ্য গরম।” এমসডিপিআই (MDPI) জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা বলছে, ২০০৫ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে এসে সিলেটের অধিকাংশ এলাকায় তাপমাত্রাজনিত চাপ উচ্চ ও তীব্র পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট এলাকায় সবুজ আচ্ছাদন হ্রাসের হার সবচেয়ে বেশি।
প্রকৃতি বিষয়ক আন্তর্জাতিক ইনডেক্স ‘ন্যাচার’-এর তথ্যমতে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সিলেট সদর ও বিয়ানীবাজার উপজেলায় নগরায়ণের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় জলাশয় ও প্রাকৃতিক জলাধার প্রায় ৭৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে পুরো অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করেছে। ইয়ুথ নেট গ্লোবালের এক্সিকিউটিভ কো-অর্ডিনেটর সোহানুর রহমান বলেন, “সিলেট একসময় সবুজের জন্য বিখ্যাত থাকলেও এখন নানা প্রকল্পের দোহাই দিয়ে তা ধ্বংস করা হচ্ছে। ধরিত্রী রক্ষায় সরকারের কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।”
বিভাগীয় বন অফিসের সহকারী বন সংরক্ষক মোহাম্মদ নাজমুল আলম বনভূমি হ্রাসের বিষয়টি স্বীকার করে জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁদের হাতে বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, “পতিত জমিতে বৃক্ষরোপণ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বনের আয়তন বাড়ানোর প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ চলছে।” তবে পরিবেশবাদীদের মতে, শুধুমাত্র চারা রোপণ নয়, বিদ্যমান পাহাড় ও বন রক্ষা করতে না পারলে সিলেটের পরিবেশগত ভারসাম্য ফেরানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: