সিলেট শহীদ মিনারের বইমেলা বন্ধ কেন?
সিলেট শহীদ মিনারে নাকি এক বইমেলার আয়োজন হয়েছিল। কারা আয়োজন করেছে, ঠিক জানি না। আবার কারা অভিযোগ করে প্রশাসন দিয়ে তা বন্ধ করিয়েছে—সেটাও পরিষ্কার না। তবে আমার ছেলে মুজাদ্দিদ বলেছে, বইমেলার আয়োজকদের সাথে সুফি সুফিয়ান-এর নাম আছে।
সুফি সুফিয়ান আমার মায়ার মানুষদের একজন। ভালো নাট্যকার-গীতিকার, সুনামগঞ্জের এক মরমী পরিবারের কৃতি সন্তান। সিলেট মহানগরের বারুতখানায় তাঁর 'নাগরী' নামে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আছে। এতে আমার প্রিয় মানুষ কবি মালেকুল হক-ও অংশীদার। সুযোগ পেলে আমি মাঝেমধ্যে যাই, নতুন বই দেখি, সামর্থ্য থাকলে কিনিও। বই কিনতে কিনতেই মানুষের প্রতি ভালোবাসা জমে—এ এক আলাদা সাহিত্যিক রোগ।
সুফি তার ফেসবুকে লিখেছে বইমেলা নিয়ে কীভাবে কী হয়েছে। সিলেটের বিএনপি ঘরের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতা শ্রদ্ধেয় শেরো ভাই প্রশ্ন তুলেছেন-যেখানে স্বয়ং মন্ত্রী উপস্থিত থাকতে সম্মতি দিয়েছেন, সেখানে কারা তা বন্ধ করিয়ে দিলো? শেরো ভাইয়ের সাথে অনেক সাংস্কৃতিক আন্দোলনে শরিক ছিলাম ছোটবেলা থেকেই। তাঁকে এবং তার পরিবারের সবাইকে আমি জানি ছোটবেলা থেকে। তিনি ইচ্ছে করলে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে আমি মনে করি।
আমি শুধু এতটুকু বলি—সুফি না, যে কেউ বইমেলা করতে চাইলে তাকে বাধা দেয় যে, সে আধুনিক যুগের চেঙ্গিস খানের খালাতো ভাই। কারণ ফ্যাসিস্ট কোনো ব্যক্তির নাম নয়, এটা এক বিশেষ চরিত্রের নাম; সুযোগ পেলেই বই দেখে ভয় পায়, মেলা দেখে কাঁপে, আর পাঠক দেখলে জ্বর আসে।
শোনা যাচ্ছে, অভিযোগ করা হয়েছে—এরা নাকি অমুক দলের দোসর, তমুক দলের লোক। আমাদের দেশে বইমেলা করতে গেলেও আগে দলীয় পরিচয়পত্র লাগে নাকি! অথচ আমি যতদূর জানি, সুফি সুফিয়ান রাজনীতি করেন না। মালেকুল হক পারিবারিকভাবে বিএনপি ঘরের মানুষ হতে পারেন। বাকিরা কে কোন দলে—তা হয়তো তারা নিজেরাও জানেন না, কিন্তু প্রতিপক্ষ খুব ভালো জানে।
এই তকমা লাগানোর শিল্পটা আমাদের দেশে অনেক উন্নত। আমি নিজে সৈয়দ মবনু—কোনো দল করি না। কিন্তু আমাকে আটকাতে গিয়ে কেউ আওয়মীলীগ, কেউ জামায়াত, কেউ বিএনপি, কেউ জমিয়ত, কেউ খেলাফত বানিয়েছে, কেউ নাস্তিকও বানিয়েছে, কেউ আবার এমন সব উপাধি দিয়েছে, যা অভিধানেও নেই।
চব্বিশের জুলাইয়ের পটপরিবর্তনের পর একটি চিহ্নিত দলের কিছু অতিউৎসাহী লোক আমাকে আবার আওয়ামী লীগ বানিয়ে ফেলল। অথচ আমি নিজেই জানতাম না! পরে হুমকি-ধমকি, মব, নাটক—সব মিলিয়ে আমাকে সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ-এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব ছাড়তে হলো। তারা তাদের লোক বসিয়ে দিলো। আমি নারাজ হইনি। কারণ, যিনি বসেছেন তিনি তাদের দলের হলেও আমার বন্ধু, আর আমি পদ-পদবী নিয়ে ভাবি না। লেখালেখিটাই আমার কাজ।
এখন ঘর থেকে কম বের হই। সারাদিন লেখাপড়া করি। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়, পৃথিবীর সাতশো কোটি মানুষের মধ্যে কেউ আমাকে চেনে না। আবার কখনো মনে হয়, সবাই আমাকে আমার চেয়েও বেশি চেনে। আমি কোন দল করি—তা আমি জানি না; কিন্তু প্রতিপক্ষ জানে। যেমন এখন তারা জানে, বইমেলা মানেই ষড়যন্ত্র, কবি মানেই এজেন্ট, আর পাঠক মানেই রাষ্ট্রদ্রোহী।
এই দেশে সবচেয়ে বেশি পরিচয় জানে মানুষ নিজেরটা না—অন্যেরটা।
আমি এই ক্ষুদ্র চিন্তার লোকগুলো থেকে ফানা চাই আল্লাহর কাছে।
লেখক
কবি,বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: