চিকিৎসা বঞ্চিত হাওরবাসী
জনবল সংকটে ধুঁকছে সুনামগঞ্জের স্বাস্থ্যখাত: ৮০৯ পদের মধ্যে ৪৩৬টিই শূন্য
তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি জনবল সংকটের কারণে সুনামগঞ্জ জেলার সার্বিক চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্যখাত চরমভাবে ধুঁকছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই তীব্র লোকবল সংকটের কারণে জেলার সদর হাসপাতালসহ ১১টি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ভেঙে পড়েছে চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থা; যেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টের চরম ঘাটতির কারণে প্রতিনিয়ত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চলের লাখ লাখ সাধারণ মানুষ। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের স্বাস্থ্য বিভাগে সর্বমোট মঞ্জুরীকৃত ৮০৯টি পদের বিপরীতে বর্তমানে ৪৩৬টি পদই সম্পূর্ণ শূন্য রয়েছে এবং বিপরীতে মাত্র ৩৭৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে কোনো রকমে পুরো জেলার চিকিৎসাসেবা চালু রাখা হয়েছে। জেলার প্রতিটি উপজেলার চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কোনো হাসপাতালেই ন্যূনতম প্রয়োজনীয় লোকবল নেই। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় মঞ্জুরীকৃত ৩০টি চিকিৎসকের পদের মধ্যে ১৯টিই শূন্য এবং কর্মরত আছেন মাত্র ১১ জন; এছাড়া সেখানে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের ৬ পদের ৪টি এবং ৩টি ফার্মাসিস্ট পদের ২টিই শূন্য রয়েছে। শিল্পাঞ্চল ছাতক উপজেলায় ৪৭টি চিকিৎসকের পদের মধ্যে ২৮টি পদই শূন্য, কর্মরত আছেন মাত্র ১৮ জন; নার্স ও মিডওয়াইফের ৪২টি পদের মধ্যে ১৫টি শূন্য এবং মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টের ৮টি করে পদের মধ্যে উভয় ক্ষেত্রেই ৭টি করে পদ শূন্য পড়ে আছে। দিরাই উপজেলায় চিকিৎসকের সংকট সবচেয়ে প্রকট; সেখানে ৪৯টি পদের মধ্যে ৩৯টি পদই সম্পূর্ণ শূন্য এবং কর্মরত আছেন মাত্র ১০ জন, পাশাপাশি নার্সের ৩৫টি পদের ১৯টি এবং ৫টি ফার্মাসিস্ট পদের সবকটিই শূন্য রয়েছে। জামালগঞ্জ উপজেলায় ২৫টি চিকিৎসকের পদের ১৫টি, নার্সের ২৩ পদের ১২টি এবং ২ জন ফার্মাসিস্টের সবকটি পদই শূন্য। প্রবাসী অধ্যুষিত জগন্নাথপুর উপজেলায় ৪২টি চিকিৎসকের পদের ২৬টি এবং নার্সের ৪৯ পদের ২৩টি পদই শূন্য পড়ে রয়েছে। ভারত সীমান্তবর্তী ধর্মপাশা উপজেলায় ৫১টি চিকিৎসকের পদের মধ্যে ৩৭টি পদই শূন্য এবং কর্মরত আছেন মাত্র ১৪ জন। দোয়ারাবাজার উপজেলায় ৩২টি চিকিৎসকের পদের ১৮টি এবং ৫টি ফার্মাসিস্ট পদের সবকটিই শূন্য রয়েছে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় মঞ্জুরীকৃত ১১টি চিকিৎসকের পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ৫ জন এবং বাকি ৬টি পদই শূন্য। নবগঠিত শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ৩৪টি চিকিৎসকের পদের ১৯টি পদই শূন্য রয়েছে। দুর্গম শাল্লা উপজেলায় ২৫টি চিকিৎসকের পদের মধ্যে ২০টি পদই শূন্য, কর্মরত আছেন মাত্র ৫ জন এবং সেখানে ৩টি ফার্মাসিস্ট পদের সবগুলোই শূন্য পড়ে আছে। এছাড়া তাহিরপুর উপজেলায় ৩০টি চিকিৎসকের পদের ২১টি, নার্সের ২৫ পদের ১০টি এবং ৬টি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদের সবকটিই শূন্য রয়েছে।
হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে এসে চরম দুর্ভোগের শিকার হওয়া দিরাই উপজেলার রোগী সামিয়া বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে শুধু ‘নাই নাই’ শুনতে হয়; সেখানে পর্যাপ্ত ডাক্তার নাই, নার্স নাই এবং সরকারি ওষুধ বা কাঙ্ক্ষিত সেবারও বালাই নাই। একই চিত্র তুলে ধরে তাহিরপুর উপজেলার রোগী জয়নব বিবি বলেন, ডাক্তার, নার্স ও সরকারি ওষুধ—এই তিনটি বিষয়ই রোগীদের চিকিৎসার জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি, কিন্তু হাসপাতালে এর কোনো একটির অভাব হলেই আমাদের মতো গরিব রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট খলিল রহমান বলেন, হাওরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে প্রথমেই প্রয়োজন জেলা সদর হাসপাতালসহ প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দ্রুততার সাথে ডাক্তার, নার্স ও প্রয়োজনীয় কারিগরি জনবল সরাসরি নিয়োগ দেওয়া; লোকবল সংকট এখানে একটি স্থায়ী রোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে এবং চিকিৎসকেরা সুনামগঞ্জের মতো দুর্গম এলাকায় এসে সাধারণত থাকতে চান না। তিনি আরও যোগ করেন, শুধু নিয়োগ দিলেই হবে না, নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতি শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে এবং সেই সঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি বাড়ানো জরুরি, অন্যথায় কোনো সুপরিকল্পিত উদ্যোগ ছাড়া হাওরাঞ্চলের মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। সুনামগঞ্জ জেলার স্বাস্থ্যখাতের এই সামগ্রিক ও ভয়াবহ সংকটের সত্যতা সরাসরি স্বীকার করে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন গণমাধ্যমকে জানান, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালসহ প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও গ্রামীণ ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট ও ল্যাব টেকনোলজিস্টের ব্যাপক ও আশঙ্কাজনক সংকট রয়েছে, যার ফলে সীমিত জনবল নিয়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা দিতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের প্রতিনিয়ত চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে; তবে এই ভয়াবহ লোকবল সংকট দ্রুত নিরসনের লক্ষ্যে আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার লিখিতভাবে এবং প্রাশসনিক উপায়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জোরালো যোগাযোগ ও জরুরি তাগিদ দিয়ে আসছি।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: